


বহুবছর পর এবার পশ্চিমবঙ্গে দু-দফায় ভোট নেওয়া হবে। একুশে মহামারি আবহে ভোট নেওয়া হয়েছিল মোট আট দফায়। মাত্র একদফায় ভোট নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল বিজেপি। ভোটগ্রহণের দফা নিয়ে অবশ্য রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বাড়তি আগ্রহ কিছু দেখা যায়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবর মানুষের পক্ষে। তিনি চান মানুষ যেন সুস্থভাবে শান্তিতে নিজেদের ভোটটা দিতে পারে। হিংসাশূন্য এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বাংলায় যে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, সেটা তিনিই শুরু করেছিলেন। ১৯৯৫ সাল থেকে দেশজুড়ে যে ভোটার সচিত্র পরিচয়পত্র (এপিক) চালু হয়েছে, সেটা তাঁরই লড়াই আন্দোলনের ফসল। তাই ভোটের ভালোমন্দ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আঙুল তোলার অবকাশ নেই। যাই হোক, জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) তাদের নিয়ম অনুযায়ী নানাদিক বিবেচনা করে অবশেষে রবিবার ঘোষণা করেছে যে পশ্চিমবঙ্গে মোট দুদিনে (২৩ ও ২৯ এপ্রিল) ভোট নেওয়া হবে। ঐতিহাসিক কারণেই বাংলা রাজনৈতিক দিক থেকে একটি স্পর্শকাতর রাজ্য। তাই এখানে প্রতিটি নির্বাচনে বাড়তি উন্মাদনার সঙ্গে বাড়তি উত্তেজনাও লক্ষ করা যায়। পরিণামে প্রতিবারই কমবেশি হিংসার বহিঃপ্রকাশ, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও ঘটে থাকে। একাধিক মানুষের প্রাণহানিও এড়ানো কঠিন হয়। নির্বাচনি সংঘর্ষ শুরু হয় ভোট ঘোষণার আগেই। হিংসাত্মক ঘটনাবলি আমাদের মন খারাপ করে দেয়—ভোটপ্রচার, ভোটগ্রহণকাল এবং নির্বাচনোত্তরকাল—তিন পর্বেই। তাই নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই বিশেষ সতর্ক থাকতে হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়। নির্বাচনের পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য রাজ্যের পুলিশ বাহিনী থাকেই। তবে সংখ্যার সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের পক্ষে সবদিক ম্যানেজ করা সম্ভব হয় না। এজন্য কেন্দ্রীয় বাহিনীও তৈরি রাখা হয়। বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয় স্পর্শকাতর কেন্দ্র বা এলাকায়।
হিংসাশূন্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ব্যাপারটাকে তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন বলেও বুঝিয়ে দিয়েছেন নানাভাবে। আর এজন্যই নির্বাচন ঘোষণার কিছু আগেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠাবার পদক্ষেপ করেছে ইসিআই। এখানেই থেমে না থেকে ইসিআই বাংলায় সর্বোচ্চ সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আধাসেনা নিয়োগ হতে পারে দু-হাজার কোম্পানি! অর্থাৎ, ২৩ ও ২৯ এপ্রিলের ভোটে অন্তত দু-লক্ষ জওয়ানের বুটের আওয়াজে কাঁপতে চলেছে বাংলা। এমনকি পর্যবেক্ষক নিয়োগেও রেকর্ড গড়তে চলেছে ইসিআই। কমিশন সূত্রে বলা হচ্ছে, এবার ৩৫০ জন পর্যবেক্ষক সক্রিয় থাকবেন, অর্থাৎ পর্যবেক্ষকের সংখ্যা হবে অন্যান্য বারের দ্বিগুণ! নির্বাচন ঘোষণার আগে জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশনের ফুল বেঞ্চ রাজ্য সফর করে গিয়েছে। সেইসময়ই জ্ঞানেশ কুমার কমিশনের জিরো টলারেন্স নীতির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি হুঁশিয়ার করেন যে, ভোটে কোনোরকম অশান্তি কমিশন বরদাস্ত করবে না। এদিকে ভোট ঘোষণার পরই রাজ্যজুড়ে চালু হয়ে গিয়েছে আদর্শ আচরণবিধি। এই বিষয়ে একগুচ্ছ নির্দেশিকাও জারি করেছে কমিশন। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, মডেল কোড অফ কনডাক্ট জারি থাকাকালে পাঁচটি রাজ্যে কমিশন ফ্লাইং স্কোয়াড এবং স্ট্যাটিক সারভেইল্যান্স টিম মোতায়েন করছে। পাঁচটি রাজ্যে ৫,৭১৩টিরও বেশি ফ্লাইং স্কোয়াড মোতায়েন করা হবে। অভিযোগ পাওয়ার ১০০ মিনিটের মধ্যেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে তারা। সামগ্রিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে মোট ৫,২০০টি স্ট্যাটিক সারভেইল্যান্স টিমও রাখছে কমিশন। দেওয়াল লিখন থেকে পতাকা টাঙানোসহ প্রচারের নানাদিকেও সীমাবদ্ধতা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি বিধিভঙ্গের অভিযোগ গ্রহণেরও একাধিক ব্যবস্থা রেখেছে ইসিআই। শীর্ষ আমলা পর্যায়েও অতিদ্রুত এবং বেনজির অদল-বদল করা হয়েছে এবার। বুথের ভিতরে এবং বাইরে নজরদারি নিয়েও অভিনব নির্দেশিকা আনা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনি ‘কালচার’ বদলে দেওয়ারই অঙ্গীকার করেছে ইসিআই। এসআইআর থেকে নির্বাচন ঘোষণা পর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমার যা যা বলেছেন, তার তাত্ত্বিক সৌন্দর্য প্রশ্নাতীত। আর এখানেই প্রশ্ন, এসব বাস্তবে কতখানি দেখা যাবে? কারণ এদেশে বহু মহামানবই অনেক খোয়াব দেখিয়ে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন মেলে ক্বচিৎ। বেশিরভাগই বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ায় পর্যবসিত হয়। পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা ছাড়াই নির্বাচন ঘোষণা করেছেন জ্ঞানেশ কুমার। এটা গণতন্ত্রের জন্য কোনো সুস্থ সংকেত নয়। ওইসঙ্গে নির্বাচিত রাজ্য সরকারের একাধিক সিদ্ধান্ত নাকচ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে অনাবশ্যক বৈরিতার পরিবেশই সৃষ্টি করেছে কমিশন। সমন্বয়ের পরিবর্তে বৈরিতা সৃষ্টির অতিসক্রিয়তা কেন? এতে হিতে বিপরীত হবে না তো? দিনের শেষে হিংসাশূন্য পরিবেশে সমস্ত যোগ্য নাগরিকের ভোটদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত না-হলে তার দায় জ্ঞানেশ কুমারের উপরেই বর্তাবে। আমরা আশা রাখব, তিনি সফল হবেন এবং জয়ী হবে গণতন্ত্র।