Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে নতুন প্রজন্মকে মানবতার পাঠ দিতে ‘থিয়োজফিক্যাল’ চর্চা মহানগরে

কলকাতায় থিয়োজফিক্যাল সোসাইটির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে মানবতার পাঠ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। বিস্তারিত জানুন।

ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে নতুন প্রজন্মকে মানবতার পাঠ দিতে ‘থিয়োজফিক্যাল’ চর্চা মহানগরে
  • ১০ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কালকাতা: দিন-ই-ইলাহি। স্কুল পাঠ্যের এই চেনা কথাটির স্রষ্টা ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যে হিন্দু, মুসলিম, জৈন, পারসি, খ্রিস্টান— সব ধর্মের লোকের মধ্যে একাত্মতা তৈরি হোক। সম্প্রীতি থাকুক পরস্পরের প্রতি। তাই তিনি বিভিন্ন ধর্ম থেকে ভালো দিকগুলি নিয়ে একটা নতুন ‘কোড’ বা আচরণবিধি তৈরি করেন, যা দিন-ই-ইলাহি। মুঘল সম্রাটের এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। কারণ, তা জনপ্রিয় হয়নি। 

Advertisement

হেলেনা পেত্রোভনা ব্লাভাতস্কি এবং হেনরি স্টিল ওলকট নামে বিশ্বের দুই প্রান্তে থাকা দু’জন শিক্ষাবিদ কি আকবরের এই কর্মকাণ্ডের কথা জানতেন? ইতিহাস আমাদের এ বিষয়ে তথ্য জোগায়নি। কিন্তু তাঁরা ১৮৭৫ সালে আমেরিকার নিউইয়র্কে এমন এক প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন, যা শেষ পর্যন্ত বর্ণ, ধর্ম, জাতির ঊর্ধ্বে উঠে এমন এক ভাবনার কথা বলেন, যেখানে সবার উপর মানুষ সত্য। তৈরি হয় অসাম্প্রদায়িক সংগঠন ‘থিয়োজফিক্যাল সোসাইটি’। বিশ্বের সব ধর্মের মধ্যে থাকা দর্শনকে আঁকড়ে ধরাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলা, ধর্মের উদার দিকগুলির তুল্যমূল্য আলোচনা ও বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শক্তির উপর গবেষণাই ছিল এই ভাবধারার প্রাণশক্তি। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান চিন্তার সঙ্গে প্রাচ্যের হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মূল প্রজ্ঞাকে মেশাতে চেয়েছিল এই সোসাইটি। গোটা বিশ্ব ধীরে ধীরে আঁচ পায় এই চিন্তাভাবনার। কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামী অ্যানি বেসান্ত ভারতে এই ভাবধারার প্রচার শুরু করেন। এই থিয়োজফিক্যাল সোসাইটির আন্তর্জাতিক সদর দপ্তর বর্তমানে ভারতের চেন্নাইয়ের আদিয়ারে অবস্থিত। ভারতীয় সদর দপ্তরটি বারাণসীতে। ৭০টি দেশে এর শাখা সংগঠন আছে, যেখানে চর্চা হয় মানবতার। থিয়োজফিক্যাল সোসাইটি কোনো নির্দিষ্ট গোঁড়া মতবাদ প্রচার না করে, সত্য অনুসন্ধানের উপর জোর দেয় এখনও। এই মতবাদকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ এবার শুরু হল কলকাতায়। সেই উদ্যোগ শুরু হয়েছে সাবর্ণ পরিবারের হাত ধরে। 
সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পরিবার পরিষদের সম্পাদক ও ইতিহাসবিদ দেবর্ষি রায়চৌধুরীর কথায়, কলকাতায় থিয়োজফিক্যাল চর্চার গোড়াপত্তন হয়েছিল আমাদের পরিবারের হাত ধরেই। ১৯০৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত আমাদের পরিবারের দুই শিক্ষাবিদ ক্ষিরোদচন্দ্র রায়চৌধুরী এবং মাখনলাল রায়চৌধুরী এই ভাবধারার চর্চা শুরু করেন ও প্রচারে সক্রিয় হন। বর্তমানে কিছু মানুষ ও চিন্তাবিদ তা নিয়ে চর্চা করেন ঠিকই, কিন্তু তা সীমিত। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ভাবধারা সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। আমরা সেই কাজটিই করছি। বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আমাদের থেকে এর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারছেন। তাঁর কথায়, বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পড়ুয়াদের ইন্টার্নশিপ করা বাধ্যতামূলক। সাবর্ণ সংগ্রহশালা ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আমাদের কাছে আসছেন ও ক্লাস করছেন। থিয়োজফিক্যাল সোসাইটিকে আমরা পাঠ্যসূচিতে রেখেছি। দেবর্ষিবাবুর কথায়, যেভাবে বর্তমানে চারদিকে অসহিষ্ণুতা, ধর্মকেন্দ্রিক হিংসা বাড়ছে, তাতে এই ভাবাদর্শ মানুষকে শান্তি দিতে পারে। আমরা পড়াশোনোর মধ্যে দিয়ে সেই চেষ্টাই করছি মাত্র।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ