শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: দীপশিখা হতে চেয়েছিলেন গবেষক। বাবা চাইতেন মেয়ে ডাক্তার হোক। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী দীপশিখা। সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় দুর্দান্ত র্যাঙ্ক। স্রেফ মেধাকে যাচাই করেছিলেন তিনি। কিন্তু ডাক্তারি পড়তে চাননি। বাবার সঙ্গে সামান্য কথা কাটাকাটি। বাঁকুড়া মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার দিনই গলায় ফাঁস দিয়ে জীবন শেষ করে দেন নন্দীগ্রামের দীপশিখা। একটা ইচ্ছের অপমৃত্যু!
তমলুক থেকে দীপশিখার বাড়ি বেশি দূর নয়। পড়শি এলাকার এক মেধাবী মেয়ের করুণ পরিণতি নাড়িয়ে দিয়েছিল জেলা সদর ও গ্রামীণকে। তাই, উৎসবেও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে গ্রামীণের একটি পুজো কমিটির থিম—‘ইচ্ছেশক্তি’। বার্তা একটাই, সন্তানের ইচ্ছেকে মর্যাদা দিন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার না হলে জীবন শেষ! এমন ভাবনা ছাড়ুন বাবা-মায়েরা।
আগমনিকে ঘিরে তমলুকের মূল শহরে থিমের আগমন অনেকে আগেই। বলতে গেলে, কলকাতার প্রায় সমসাময়িক। বেশ কয়েকবছর হল থিম-যুদ্ধে শামিল গ্রাম তমলুকও। হরেক ভাবনার মেলবন্ধন ঘটছে প্যান্ডেল, প্রতিমায়। ‘ইচ্ছেশক্তি’ একটা উদাহরণ। এরকম অনেক থিমে গ্রামীণ দুর্গোৎসব এবার জমজমাট। ছোটবড় সব মিলিয়ে পুজোর সংখ্যা প্রায় ৭০টি। তার মধ্যে আট-দশটি বিগ বাজেটের পুজোয় ভাবনার কোলাজ। কোথাও ‘নারীশক্তি’। কোথাও আবার বাঙালির আবেগ ‘সহজপাঠ’।
তমলুক ব্লকের শালিকা দামোদরপুর শক্তি সংঘ। এবার দীপশিখার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে থিম করেছে ‘ইচ্ছেশক্তি’।তমলুক-পাঁশকুড়া রোডে বিবেকানন্দ মোড়ে ওই পুজো এবার ২২বছরে পড়ল বলে জানিয়েছেনক্লাবের সম্পাদক অর্ণব চক্রবর্তী। চতুর্থীতে উদ্বোধন। তমলুক ব্লকের কুলববেড়্যা ঐক্যতান ক্লাবের থিম এবার ‘নারীশক্তি’। দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ময়দান থেকে মহাকাশ। সর্বত্র ‘অর্ধেক আকাশ’-এর জয়জয়কার। নারীরা সুযোগ পেলে পুরুষকেও টেক্কা দিতে পারে। ঐক্যতানের মূল ভাবনা এটাই। পুজো হয় কুলবেড়্যা ভীমদেব আদর্শ বিদ্যাপীঠ ময়দানে। সেখানেবিশাল মেলাও বসে। ক্লাব সম্পাদক দেবরঞ্জন জানা বলছিলেন, ‘আমাদের পুজো ১১বছরে পড়ল। বাজেট প্রায় ১৮লক্ষ টাকা। পঞ্চমীতে উদ্বোধন।’
শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের রামচন্দ্রপুর জনকল্যাণ কমিটির থিম এবার ‘সহজপাঠ’। রবিঠাকুরের সহজপাঠে থাকা প্রতিটি ছড়া ও ছবি মডেল আকারে তুলে ধরা হয়েছে প্যান্ডেলে। রামচন্দ্রপুর হাইস্কুল মাঠে আয়োজন প্রায় সম্পূর্ণ। ক্লাব সম্পাদক গণেশ গিরির কথায়, ‘আটচালা মণ্ডপজুড়ে সহজপাঠের ছড়া ও ছবি সাজানো থাকবে।’ রাধামণি সংলগ্ন জয়রামবাটি সংঘশ্রী ক্লাবের থিম ‘টাঁড়বাড়ো’। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমরসৃষ্টি আরণ্যক উপন্যাসের বুনো মহিষের দেবতাকে এখানে উপস্থাপেনর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেবীবন্দনায়ও রয়েছে বৈচিত্র। দুর্গার পাঁচটি রূপের পুজো হয় এখানে। ক্লাব সভাপতি কমল মাইতি বলছিলেন, ‘আমাদের পুজো ৩২বছরে পা দিল। বাজেট প্রায় ১৫লক্ষ টাকা। পঞ্চমীতে উদ্বোধন।’
শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকে নোনাকুড়ি সাংস্কৃতিক সংস্থা ও কাঁকটিয়া সর্বজনীন দুর্গোৎসব বেশ কয়েকবছর দর্শক টানার ক্ষেত্রে নাম কুড়িয়েছে। নোনাকুড়ি সাংস্কৃতিক সংস্থা মঙ্গলঘটের আদলে মণ্ডপ তৈরি করছে। দেবী দুর্গাকে বাংলার বধূ হিসেবে পুজো করা হবে। দেবীর কোলে থাকবে তাঁর সন্তানসন্ততি। এয়োস্ত্রী মেয়েদের সাজের নানা উপকরণ দিয়ে মণ্ডপ সাজানো হয়েছে বলে ক্লাব সম্পাদক জয়দেব বর্মন জানিয়েছেন। গ্রামীণ তমলুকের প্রাচীন পুজোর মধ্যে কাঁকটিয়া সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি উল্লেখযোগ্য। এখানকার পুজো ৭৪বছরে পড়ল। সম্পাদক যতীন সামন্ত বলেন, ‘পঞ্চমীতেই উদ্বোধন।বাজেট প্রায় ১৪লক্ষ টাকা।’ অজয় মুখোপাধ্যায় তখন মুখ্যমন্ত্রী। রামতারক বাজারের পুজোর উদ্বোধন করেছিলেন তিনি। সেই হোগলবেড়িয়া-রামতারক দুর্গোৎসব কমিটির পুজো এবার ৭৯বছরে পা দিল। পুজো কমিটির কর্মকর্তা সুব্রত অধিকারী বলেন, ‘পঞ্চমীর দিন উদ্বোধন। সেদিন ১০বছরের কম বয়সিদের নিয়ে রাধা ও কৃষ্ণ সাজো প্রতিযোগিতা রয়েছে।’ • দেবী প্রতিমা। -নিজস্ব চিত্র