‘বিষাণ’। বাংলায় শৃঙ্গাকার বাদ্যযন্ত্র ও পশুশৃঙ্গ উভয় অর্থেই শব্দটির ব্যবহার রয়েছে। মূলত গরু ও মহিষের শিং থেকে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করাই বিষাণ শিল্প নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে প্রথমদিকে শুধু চিরুণি তৈরি করা হতো। পরে তা থেকে খুদেদের জন্য হরেক রকমের খেলনা বানাতে শুরু করেন কারিগররা। ভারতবর্ষে এই শিল্পের জন্য বিশেষ খ্যাতি রয়েছে মেদিনীপুরের। ঠিক কবে শুরু, তা অবশ্য বলা মুশকিল। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার পূর্বাংশে অর্থাৎ দূর্বাচটি নদীর মোহনা এলাকার দু’পাশের গ্রামগুলিতে গড়ে ওঠে বিষাণ শিল্পের কারখানা। মূলত বৈষ্ণবচক, ভোড়দহ, কলাগাছিয়া, পদিমাচক, কুলটিকরি, জোতঘনশ্যাম, মাগুড়িয়া, গোমকপাতা, নারায়ণচক সহ একাধিক গ্রামের কারিগরদের তৈরি চিরুণি তখন ঘরে ঘরে শোভা পেত। পরের দিকে ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের প্রভাব পড়ে ভারতের গ্রামীণ হস্তশিল্পেও। বাজারে ঢুকে পড়ে সেলুলয়েড ও প্লাস্টিকের চিরুণি। দামে সস্তা, ওজনে হাল্কা এবং সুদর্শন হওয়ায় তা ক্রেতাদের নজর কাড়ে। মন্দা নেমে আসে বিষাণ শিল্পে। টিকে থাকতে বিকল্প উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে থাকেন কারিগররা। শুরুতে গোটা শিং ওজন দরে কিনতে হতো। কিন্তু চিরুণি তৈরিতে এর সামনের দিকের অংশ কাজে লাগত না। তা ফেলে দিতেন কারিগররা। এবার সেই ফেলে দেওয়া নিটোল অংশ দিয়েই নানা শৌখিন দ্রব্য—ঘর সাজানোর জিনিস, খেলনা, নস্যির কৌটো, পেনদানি, চাবির রিং, সিগারেট পাইপ, বোতাম, ছুরির বাঁট, হারমোনিয়ামের রিড সহ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নানা সামগ্রী তৈরির কাজ শুরু হল। নতুন করে যেন প্রাণ পেল বিষাণ শিল্প। ১৯৫৫ সালের গোড়ার দিকে বৈষ্ণবচক গ্রামে একটি সরকারি বিষাণ শিল্প শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয়। সেখানে শিল্পীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ওড়িশা থেকে আসেন প্রশিক্ষক নীলকণ্ঠ মহারানা। ১৯৬৫ সালে ১৫ জন সদস্যকে নিয়ে গড়ে ওঠে বৈষ্ণবচক বিষাণশিল্প সমিতি। পরের দিকে রাজ্য সরকারের সাহায্যে এই শিল্পের বিকাশ ঘটে। বর্তমানে যা দেশের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়েছে কানাডা, ইতালি, জার্মানিতেও।



