


ভগবানগোলার নুরুল ইসলাম। বিকাশ ইন্ডিয়া পার্টির প্রার্থী। তাঁর প্রতীক গ্যাস সিলিন্ডার। অন্যদিকে, একই আসনে নির্দল প্রার্থী হিসাবে লড়তে নেমেছেন একরামুল হক। তাঁরও পছন্দের সিম্বল গ্যাস সিলিন্ডার। কিন্তু আবেদনের সময় তাঁকে যার পর নাই হতাশ হতে হল। কেননা ততক্ষণে গ্যাস সিলিন্ডারের দখল পেয়ে গিয়েছেন নুরুল সাহেব! নির্বাচনি রাজনীতিতে গ্যাসের আকাল কেবল গ্রাম-মফস্সলেই নয়, অবিকল মহানগর কলকাতাতেও। দেবাশিস দেবনাথ নামে একজন রাসবিহারী আসনে নির্দল হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে বড্ড দেরি করে ফেলেছেন। এজন্য তিনিও গ্যাসের নাগাল পাননি, দাবি জানিয়ে শোনেন একমাত্র সিলিন্ডারটি ইতিমধ্যেই বণ্টিত। ভোটবাজারের খবর, প্রতীক হিসাবে সিলিন্ডারের চাহিদা অনেক জায়গাতেই। কিন্তু চাহিদা থাকলেই তো হয় না, জোগান যে ভীষণ সীমিত। সিম্বল হিসাবে গ্যাস সিলিন্ডার এত পছন্দ কেন বহুজনের? এনিয়ে গবেষণার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। সৌজন্যে পশ্চিম এশিয়ায় হঠাৎ বিধ্বংসী যুদ্ধ।
আমরা জানি, অঞ্চলটি খনিজ তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে পেট্রপণ্যের উৎপাদন, জোগান ও আমদানি-রপ্তানি তলানিতে নেমে এসেছে। সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ ভারতের জনজীবনে পড়েছে এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব। কারণ ভারতে খনিজ তেলের মোট চাহিদার ৮৮ শতাংশের বেশি পূরণ করা হয় আমদানি থেকে। গ্যাসের মোট প্রয়োজনের ৫০ শতাংশের অধিক ভারত আমদানি সূত্রে মিটিয়ে থাকে। এমনকি বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সত্ত্বেও ভারতকে ১৫-২০ শতাংশের মতো আমদানিকৃত কয়লা ব্যবহার করতে হয়। মোদ্দা কথায়, প্রাইমারি এনার্জি সাপ্লাই বা প্রাথমিক শক্তির জোগানের কমবেশি ৪০ শতাংশ ভারতকে আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। বাস্তবিকই প্রবল গ্যাস সংকটে সারা দেশের সঙ্গে বাংলাও। আগের মতো ‘চাহিবামাত্রই’ পাওয়া যাচ্ছে না। মার্চের গোড়ার দিকে রান্নার গ্যাস, গাড়ির জ্বালানি গ্যাস প্রভৃতি বুকিং করতেই হিমশিম অবস্থা ছিল। সেই সমস্যা পরে সামান্য কমলেও জোগান এখনো সমস্যাসংকুল, সীমিত এবং তার উপর আরোপ করা রয়েছে একাধিক বিধিনিষেধ। বলা বাহুল্য, এই মওকায় বেড়েছে দাম এবং কালোবাজারি। শুধু অসাধু কারবারিদের দুষে লাভ কী? সরকার নিজেও আম আদমির পকেট কাটার নানা ফিকির বার করেছে। এই যেমন ১৪.২ কেজির জোগান কমিয়ে বাড়ানো হয়েছে ৫ অথবা ২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি। বলা বাহল্য, ছোটো সিলিন্ডারের যে দাম রাখা হয়েছে তাতে ক্রেতাকে প্রায় দ্বিগুণ টাকা গুনতে হচ্ছে।
নয়া নিয়ম অনুযায়ী, ২৫ দিনের মধ্যে রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে গেলে গৃহস্থ বাধ্য হচ্ছেন বেশি দামে ছোটো সিলিন্ডার কিনতে। গতমাসে এক ধাক্কায় ৬০ টাকা দামবৃদ্ধির পর কলকাতায় ১৪.২ কেজি সিলিন্ডারের দর হয়েছে ৯৩৯ টাকা। আর এমাসে ৫ কেজির দাম ধার্য হয়েছে ৫৮৩ টাকা। এই ধরনের সিলিন্ডারকে বলা হয় এফটিএল। যখন তখন এবং যত খুশি কেনা যাবে। অর্থাৎ, দেশে বাণিজ্যিক ও ডোমেস্টিক সিলিন্ডার সংকটের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ৫৮৩ টাকা দরে ৫ কেজির তিনটি সিলিন্ডার কিনতে লাগবে ১,৭৪৯ টাকা। অথচ, বুকিংয়ের সময় এভাবে ২৫ দিনে বেঁধে না দিলে গ্রাহক ১৪.২ কেজির সিলিন্ডার পেয়ে যেতেন ৯৩৯ টাকায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই বর্ধিত দাম দিয়ে যত খুশি এলপিজি কেনা যাবে। ডিস্ট্রিবিউটরদের একাংশের আরো বক্তব্য, এই অবস্থায় ছোটো সিলিন্ডার বিক্রির জন্য তাঁদের উপর রীতিমতো চাপ সৃষ্টিও করা হচ্ছে। গৃহস্থ বাজার করলেন না-হয় কষ্টেসৃষ্টে কিন্তু গ্যাস ছাড়া রান্না হবে কী করে? শুধু গৃহিণীর হেঁশেলেই গ্যাসের আকাল নয়, সংকটের সংক্রমণ ঘটেছে অন্যান্য জায়গাতেও। স্কুলে গরিব ছেলেমেয়েদের মিড ডে মিল রান্না ব্যাহত হচ্ছে। রান্নার পদ কমেছে হোটেল, রেস্তরাঁ, ক্যান্টিনে। মেনুর সঙ্গে আপস করছে ক্যাটারিং সংস্থাগুলি। বিয়েবাড়িতে ভূরিভোজনেও লাগাম পরাতে বাধ্য হচ্ছেন বেশিরভাগ আয়োজক। ভোটের বাজারে আলোচনার কেন্দ্রে ভীষণভাবেই উপস্থিত রান্নার গ্যাস। এমনকি ‘ভিলেন’ এসআইআর-ও পড়ে গিয়েছে এলপিজির পিছনে! যাঁদের জন্য কোনো জনপ্রিয় পার্টির নির্দিষ্ট সিম্বল বরাদ্দ নেই, সেইসব ভোটপ্রার্থী এমন একটি প্রতীক বেছে নিতে চান, যেটি সকলের চেনা। তাহলে ভোটযন্ত্রে সেই প্রার্থীকে খুঁজে পেতে সমর্থকদের কসরত করতে হয় না। সেদিক থেকে ছাব্বিশের মহারণে সিম্বল হিসাবে গ্যাস সিলিন্ডারই পয়লা নম্বর!