রঙ্গন বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: জাপানে একটি চা পানের আসরে নিমন্ত্রিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দেশে ফিরে শান্তিনিকেতনে শুরু করেছিলেন চা-চক্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় ব্রিটিশদের বোমারু বিমান নেদারল্যান্ডের মাটিতে চায়ের পেটি ফেলেছিল। জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা দিতে এই কাণ্ড ঘটিয়েছিল ইংরেজরা। চা’কে ঘিরে বিশ্বজুড়ে এরকম কত ইতিহাস, কত উত্থান-পতন, কত গপ্পো, কত না কথা। সেই চা ছাড়া বাঙালির চলে না। এবার পুজোর থিমেও বাঙালির অন্যতম প্রিয় এবং প্রয়োজনীয় পানীয় চা। দক্ষিণ কলকাতার আলিপুর সর্বজনীন তৈরি করেছে থিম, ‘চা-পান-উতোর’।
এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই...। সুমনের গানটি কালজয়ী। চা নিয়ে নজরুল পর্যন্ত লিখে গিয়েছিলেন কবিতা। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত চীনা কবিতা অনুবাদ করেছিলেন। বাঙলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে চায়ের ছড়াছড়ি। এই সব জানা-না জানা গল্পই তুলে ধরেছে আলিপুর। তাদের ওখানে ঠাকুর দেখতে গেলে জানা যাবে, এদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চা নিয়ে এসেছিল। পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতে ঢুকেছিল চা। তারপর বাংলা, অসমে চা বাগান তৈরি হতে থাকে। ধীরে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই পানীয়। চা নিয়ে এমন হাজার তথ্য পেতে হলে যেতে হবে আলিপুর। এই পুজো এবার ৮০ বছরে পা দিয়েছে। নিউ আলিপুর থেকে শুরু হয়ে দুর্গাপুর সেতু শেষে যে রাস্তাটি সোজা আলিপুরে গিয়েছে, তার ধারেই হয়েছে মণ্ডপ। বৌদ্ধ চৈত্যের (মন্দির) আদলে প্যান্ডেল। মণ্ডপজুড়ে চা সংক্রান্ত অসংখ্য ঘটনার কোলাজ। মণ্ডপে ঢোকার পথে বিমানের কাঠামো। তার নীচে লোহার পাতে লেখা চায়ের অজানা ইতিহাস।
পুজোর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৌশিক ভট্টাচার্য বলেন, ‘নিছক পুজো নয়, প্রতিবছরই আমরা মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার মতো বিষয়কে থিম করি।’ আকাদেমি অব ফাইন আর্টসের দেড়শো শিল্পী মণ্ডপ তৈরির কাজ করেছেন। মাটি, প্লাই, ফাইবার গ্লাস, কাঠের ব্লক দিয়ে তৈরি হয়েছে প্যান্ডেল। তাতে দেশ-বিদেশের চা সংস্থাগুলির সেই সময়ের বিজ্ঞাপন আছে। চা নিয়ে ডাক টিকিট রয়েছে। দুর্গার প্রতিমা এখানে তিব্বতের থানুকা অঙ্কন শৈলীর আদলে গড়ে উঠেছে। মণ্ডপের ভিতর চা বাগানের শ্রমিকদের মডেল ও ফ্রেসকো আর্ট পেইন্টিং। উদ্যোক্তাদের দাবি, ‘এসব মন কাড়বে দর্শনার্থীদের’। থিম শিল্পী অনির্বাণ দাস বলেন, ‘একদিন চা খেতে খেতেই মাথায় আসে, জনপ্রিয় এই পানীয়ের থিমে মণ্ডপ গড়া হবে। তারপর চা নিয়ে গবেষণা করা অনিতেশ চক্রবর্তী ও কৌস্তুভ চক্রবর্তীর সঙ্গে আলোচনা করি। খুঁটিনাটি তথ্য জেনে সেই ভাবনা বুনেই গড়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপ।’ এর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে দীঘার জগন্নাথ মন্দির। রাসবিহারী থেকে লেক মলের দিকে যেতে ডাইনে পরাশর রোড। সেখানে পরাশর নবোদয় সংঘের পুজো। তারা করছে জগন্নাথ মন্দির। এবার ৫৫ বছরে পা দিয়েছে তাদের পুজো। কাঠ, বাঁশ, ফাইবার গ্লাস ও কাপড় দিয়ে তৈরি মণ্ডপ বেশ জমকালো। প্রতিমা সাবেকি ধাঁচের। পুজোর সম্পাদক ইন্দ্রজিৎ পাল বলেন, ‘শহর ও গ্রামের বহু মানুষ যাঁরা দীঘার জগন্নাথ মন্দির দেখতে যেতে পারেননি, তাঁরা আমাদের মণ্ডপ দর্শন করলে সে মন্দিরের কিছু আস্বাদ পাবেন।’