সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, বারুইপুর: বারুইপুর রাসমাঠের আশপাশে গিয়ে যে কোনো কাউকে সজলদার দোকান কোথায় বললেই দেখিয়ে দেবে। এতটাই পপুলার সজল সাহা। তাঁর যে চায়ের দোকান সেখানে একসময় বসে মাটির ভাঁড়ে আয়েসের চুমুক দিয়েছেন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তরুণকুমার, সুনীল মুখোপাধ্যায়। আরও নামকরা কয়েকজনও আসতেন চা খেতে। যেমন সঙ্গীতশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য, চিত্র পরিচালক অতনু রায়চৌধুরী। দোকানে বসে রীতিমতো আড্ডা জমাতেন ফুটবলার প্রতাপ ঘোষ, অমিত ভদ্র, বিকাশ পাঁজি প্রমুখ। সজলদার বয়স ৬৮। এখন একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবুও ওষুধের বাক্স নিয়ে রোজ সকাল- বিকাল দোকানে আসেন, চা বিক্রি করেন। বলেন, ‘বাড়িতে বসে থাকলে প্রেসার, সুগার বাড়বে। তাই দোকানে চলে আসি।’ তাঁর দোকানে লিকার চা, হজমলা চা, লেবু চায়ের বেশ কদর। রোজই খদ্দেরদের ভিড় বাড়ছে।
বারুইপুর সাহাপাড়ায় বাড়ি সজলবাবুর। স্ত্রী, দুই ছেলে, বউমা, নাতি নিয়ে ভরভরন্ত সংসার। রাসমাঠে ঢোকার মুখে তাঁর চায়ের দোকান। এককালে দরমার বেড়া আর টালির চালের ছাউনি ছিল। রাস উৎসব, যাত্রা, নাটক ইত্যাদি অনুষ্ঠান লেগেই থাকত ওখানে। সে কারণেই আসতেন অভিনেতারা। অভিনেতা সুনীল মুখোপাধ্যায় বারুইপুরেরই মানুষ। তিনি মাঝেমধ্যেই আসতেন। ন’বছর থেকে চায়ের দোকানে বসছেন সজল। সেকালে ছিল মাটির ভাঁড়। তা এখনও চালু আছে। তরুণ কুমার, সৌমিত্ররা গল্পের ঝাঁপি খুলতেন। আরও নানা ধরনের আলোচনা হত। ‘শুনতে শুনতে হাঁ হয়ে যেতাম,’ বললেন সজলবাবু। ওঁরা শ্যুটিং করতে আসতেন সিনেমার। আর এখানে গল্প হত।
সেই দোকানে এখন আর দরমার বেড়া নেই। অমিয় রায়চৌধুরীদের জায়গায় পাকা ঘর হয়েছে। টালির চালটি শুধু রয়ে গিয়েছে। সজলদা কেটলিতে জল ফোটাচ্ছিলেন। বললেন, ‘বাবুদের মাঠে অনুষ্ঠান, সভা, সমিতি, খেলা লেগেই থাকত। ফুটবলাররা খেলার পর চা খেতে আসতেন। অমিত দাস, প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম সরকার, কৃশানু দে, কত যে নামকরা ফুটবলার এসেছেন, ইয়ত্তা নেই।’ বলতে বলতে নস্টালজিক হয়ে পড়েন সজলবাবু। বললেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সভা করতে এলে চা যেত এই দোকান থেকেই। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের চা এখান থেকেই যেত। দোকানে না এলে আমার মন ভালো থাকে না। কত মানুষ আসেন। কত কথা হয়। মত বিনিময় হয়। বহুরূপীরা আসেন। দোকানটাই আস্ত একটা দুনিয়া।’ নিয়মিত আসা ক্রেতারা বলেন, ‘সজলের চা একবার খেলে আবার খেতে হয়, এত সুন্দর। লোকটা আরও সুন্দর। মাটির মানুষ।’ নিজস্ব চিত্র