


রাহুল চক্রবর্তী, কলকাতা: এ যেন উলটপুরাণ!
বিশ্বে কোনও অস্থিরতা দেখা দিলে তার ঢেউ আছড়ে পড়ে বাজারে। তখন শেয়ার থেকে অর্থ সরিয়ে ফেলে নিরাপদ বিকল্প খোঁজেন উদ্বিগ্ন লগ্নিকারীরা। যার প্রভাবে শেয়ারবাজারে সূচক নামতে থাকে। উলটোদিকে, বেড়ে যায় সোনার কদর। যুগ যুগ ধরে যা পরিচিত ‘সেফ হেভেন’ হিসেবে। এটাই হল সাধারণ ট্রেন্ড। কোভিডকালে সোনার দামে প্রতিদিন নিত্যনতুন রেকর্ড লক্ষ্য করা গিয়েছিল। অথচ ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সোনার দর মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পায়নি। বিগত কয়েকদিন ধরেই তার দাম একটু করে কমেছে। একই চিত্র রুপোতেও। এই পতনের কারণ কী? ভবিষ্যতে কি সোনা-রুপোর দাম আরও কমতে পারে? নাকি বাউন্স ব্যাকের সম্ভাবনা? জানুন কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্য বলছে, ২ মার্চ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যে বিএসই সূচক সেনসেক্স তিন হাজার ৫০০ পয়েন্টের বেশি পড়েছে। এই সময়কালের মধ্যে ওয়েস্ট বেঙ্গল বুলিয়ান মার্চেন্টস অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কলকাতার বাজারে প্রতি ১০ গ্রাম খাটি সোনার বারের দর ১২ হাজার ৫০০ টাকার বেশি কমেছে। এর মধ্যে আজ, বুধবারই আগের দিনের তুলনায় হলুদ ধাতুর দাম কমেছে ১০০ টাকার বেশি। অন্যদিকে, শেষ ১৭ দিনে প্রতি কিলোগ্রাম রুপোর বারের দাম কমেছে প্রায় সাড়ে ৪২ হাজার টাকা। একদিনে দর কমেছে ৬ হাজার ৩০০ টাকা।
তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেল ইরান যুদ্ধ চলছে। এবং এখনই তা থামার কোনও সংকেত পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন হল পশ্চিম এশিয়ায় এই অশান্তির আবহেও কেন সোনার দর মাথাচাড়া দিচ্ছে না? উলটে তা কমছে কেন? এর কারণ হিসেবে একাধিক বিষয় তুলে ধরেছে তথ্যভিজ্ঞ মহল। বাজার বিশেষজ্ঞ নীলাঞ্জন দে’র বিশ্লেষণ, অতি সম্প্রতি ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক সহ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার প্রবণতা কিছুটা কমেছে। যার ফলে এর দরে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি তাঁর পর্যবেক্ষণ, সম্প্রতি খুচরো লগ্নিকারীরাও সোনা বিক্রি করে মুনাফা পকেটস্থ করছে। যার ফলে দরে দেখা যাচ্ছে অস্থিরতা।
অন্যদিকে, বণিকসভা এমসিসি-র কাউন্সিল অন ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনসিওরেন্স-এর চেয়ারম্যান স্মরজিত মিত্র’র মতে, চলতি যুদ্ধের মধ্যে ডলার শক্তিশালী হয়েছে। সঙ্গে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডেও মিলছে ভালো রিটার্ন। ফলে লগ্নিকারীদের কাছে নিরাপদ লগ্নির বিকল্প বেড়েছে। স্বল্প মেয়াদে হলেও বিশ্বজুড়ে এই দুই ইনস্ট্রুমেন্টে লগ্নি আসছে। যে কারণে আগে অস্থির সময়ে সোনা বা রুপোর যতটা কদর বাড়ত, এখন তা দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।
রুপোর দামে অস্থিরতার কারণ হিসেবে নীলাঞ্জনবাবু সংযোজন, শিল্পে চাহিদার কারণে সম্প্রতি রুপোর দামে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। ফান্ড ম্যানেজাররা সেখানে টাকা রাখছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি সেখানেও বিক্রি করে মুনাফা ঘরে তোলার চিত্র দেখা গিয়েছে।
আগামী দিনে সোনা-রুপোর দাম কোনদিকে যেতে পারে? শেয়ার বাজার পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনে সোনায় লগ্নির প্রবণতা বজায় থাকবে বলে ধারণা নীলাঞ্জন দে’র। তাঁর ব্যাখ্যা, ভারতে মুদ্রাস্ফীতি ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সোনার প্রতি লগ্নিকারীদের আগ্রহ থাকা খুব স্বাভাবিক। যুদ্ধ চলতে থাকলে এই প্রবণতা বাড়বে বই কমবে না। চলতি বছরে এর দরে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। স্মরজিতবাবু অবশ্য এই ব্যাপারে নির্দিষ্ট মন্তব্য করতে নারাজ। তবে বছর শেষে সোনার দরে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি বা পতন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।