অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: শুধু রাজবাড়ি, মাটির পুতুল কিংবা সরস্বতী পুজোর শহর নয়। নদীয়ার কৃষ্ণনগরের মাটিতে মিশে রয়েছে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস। নীলকরের বিরুদ্ধে কৃষকের প্রতিরোধ থেকে স্বদেশি আন্দোলন, বাঘা যতীনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড থেকে কৃষ্ণনগর বোমা মামলা, অসহযোগ থেকে ভারত ছাড়ো স্বাধীনতার সংগ্রামের একাধিক অধ্যায়ের সাক্ষী এই শহর ও সংলগ্ন এলাকা।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নীল বিদ্রোহ। ১৭৭৯ সালে বাংলায় নীল চাষের অনুমতি দেওয়া হলেও শোষণের জেরে তা কৃষকদের কাছে অভিশাপে পরিণত হয়। অগ্রিম ঋণের ফাঁদে ফেলে কৃষকদের জোর করে নীলচাষ করানো হত। দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ১৮৫৯ সালে বিস্ফোরিত হয়। যশোর ও নদীয়ায় কৃষকরা নীলচাষ বন্ধের দাবিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কৃষ্ণনগরের কাছে চৌগাছায় বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে কৃষকরা আন্দোলনে নামেন। নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ও কৃষকদের প্রতিরোধ পরে দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’-এ উঠে আসে। ১৮৬০ সালে সরকার বাধ্য হয় ইন্ডিগো কমিশন গঠন করতে।
নীল বিদ্রোহের পরেও কৃষ্ণনগরের রাজনৈতিক আবহ স্তিমিত হয়নি। ১৮৮৪ সালে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে তৎকালীন তরুণ সমাজ প্রতিবাদী মনোভাবের পরিচয় দেন। তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন এই জেলার সন্তান তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৮৮৩ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারাবাসের সময় জাতীয় তহবিল গড়ার প্রস্তাব দেন তিনি। পরে সেই তহবিলে সংগৃহীত প্রায় ২০ হাজার টাকা বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে ব্যবহার করা হয়।
বিদেশি পণ্য বয়কটের আন্দোলনও ছড়িয়ে পড়ে নদীয়ার নানা প্রান্তে। নবদ্বীপের পণ্ডিতরা বিদেশি লবণ ও চিনি বর্জনের পক্ষে দাঁড়ান। ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরেও বয়কটের প্রচার চলতে থাকে। এই সময়েই কৃষ্ণনগরে তৈরি হতে থাকে শরীরচর্চা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পরিকাঠামো। সেই ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
তথা বাঘা যতীন। মামার বাড়িতেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। পরে কৃষ্ণনগর এভি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন। কৃষ্ণনগর পাবলিক লাইব্রেরির পিছনে একটি শরীরচর্চার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য তরুণদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। বিপ্লবীদের অর্থ সংগ্রহের জন্য নদীয়া ও সংলগ্ন এলাকাতেও একাধিক রাজনৈতিক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ওড়িশার বুড়িবালাম নদীর তীরে পুলিশের সঙ্গে বাঘা যতীনের সশস্ত্র সংঘর্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নদীয়ার যতীশ-সহ কয়েকজন। এরপর আসে অসহযোগ আন্দোলন। নাগপুর কংগ্রেসের পর আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছায় কৃষ্ণনগরে। পাবলিক লাইব্রেরি ময়দান ও টাউন হলে বিপিনচন্দ্র পাল জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসও তিলক স্বরাজ্য তহবিলের জন্য অর্থ সংগ্রহে কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন। ১৯২১ সালে কৃষ্ণনগরের গারাবিনি কটেজে জাতীয়তাবাদীদের গোপন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
১৯২৬ সাল ছিল কৃষ্ণনগরের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ও. বছর শহরে অনুষ্ঠিত হয় বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল কনফারেন্সের বার্ষিক অধিবেশন। সেই সময় কৃষ্ণনগরে ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জাতীয়তাবাদী গান এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর তরুণদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করে। একই বছরে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত হয় অল-বেঙ্গল যুব সম্মেলন এবং অল বেঙ্গল স্টুডেন্টস’ কনভেনশন। তুলসী গোস্বামী ও সরোজিনী নাইডুর মতো ব্যক্তিত্বরা এই সম্মেলনে এসেছিলেন। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনার পর বাংলার আন্দোলনে জোর আসে। তার প্রভাব পড়ে কৃষ্ণনগরেও। ১৯৩১ সালের ১৭ মার্চ রাতে পুলিশ সুপারের বাংলো, কোতোয়ালি থানার ভবন এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার এক ইনস্পেক্টরের বাড়িতে বোমা মারা হয়। এই ঘটনা ‘কৃষ্ণনগর বোমা মামলা’ নামে পরিচিত হয়। এই বোমা মামলার রায় ঘোষণার দিনই কৃষ্ণনগরে বড় জনসভায় যোগ দেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। রাজেন্দ্র প্রসাদ, কেএফ নারিমান, এমএস আনে-র মতো নেতারাও সেখানে বক্তব্য রাখেন। আর ১৯৪২ দালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের অভিঘাতও এড়াতে পারেনি নদীয়া। এই আন্দোলনেরও ব্যাপক প্রভার পড়েছিল নদীয়া জেলায়। • নিজস্ব চিত্র