নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: টাকার পতনে লাগাম পরানো যাচ্ছে না। ডলারের নিরিখে যেভাবে টাকা নিম্নমুখী হচ্ছে, তা দেশের অর্থনীতিকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে। শুধু মার্কিন ডলারই নয়, অন্যান্য দেশের মুদ্রার কাছেও ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে ভারতীয় টাকা। সেই তথ্য সামনে এনেছে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই)। তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে এমনিতেই জ্বালানির দর চড়া। তার উপর নিম্নমুখী টাকার কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ। যে চড়া দরে তেল কিনতে হচ্ছে ভারতকে, তাতে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েও রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির লেকসান বাগে আনা যাচ্ছে না। সেই ক্ষতি পোষাতে এখনো লিটার পিছু গড়ে ছটাকা দাম বাড়াতে হবে। আর সেই বোঝা সাধারণ মানুষের উপর চাপাতে না চাইলে কেন্দ্রীয় সরকারের লিটার পিছু পাঁচ টাকা শুল্ক কমানো উচিত বলে মনে করছে তারা। এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এসবিআই।
কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে এক হাজার কোটি টাকা। মে মাসে পরপর চার দফায় লিটার পিছু গড়ে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে সাড়ে সাত টাকা, জানিয়েছে এসবিআই। তাদের দাবি, এর ফলে চলতি অর্থবর্ষ শেষে তেল সংস্থাগুলির লোকসান ৫৬ শতাংশ কমবে। তা পুরোপুরি কমাতে লিটার পিছু দাম ছটাকা কমানো দরকার। সেই পথে কি হাঁটবে কেন্দ্র? এদেশে যেসব পণ্য আমদানি করা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে সেগুলির একাংশের দাম বাড়লে, এদেশের ক্রেতাদের উপরও সেই মূল্যবৃদ্ধির চাপ এসে পড়ে। স্টেট ব্যাংক বলছে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের পর থেকে এখানে এপ্রিল পর্যন্ত সেই আমদানিনির্ভর মূল্যবৃদ্ধির চাপ মালুম হয়নি আম জনতার। কিন্তু মে মাস থেকে তারা তা হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছে। ব্যাংকটির ধারণা, আমদানিনির্ভর মূল্যবৃদ্ধির হার এপ্রিলের ৬.৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে মে মাসে ৭.৩ শতাংশ হবে। অর্থাৎ তা বাড়তে পারে ১ শতাংশ। শুধুমাত্র লিটার পিছু সাড়ে সাত টাকা পেট্রল, ডিজেলের দামবৃদ্ধির কারণেই সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি বেড়ে যেতে পারে ৪০ বেসিস পয়েন্ট বা ০.৪ শতাংশ পর্যন্ত, আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্টেট ব্যাংক।
দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ব্যাংকটি মনে করছে, টাকার পতনের সঙ্গে যেন কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছে না আমাদের দেশ। তাদের রিপোর্ট, এক ডলারের নিরিখে টাকার দাম ৬৫ থেকে ৭০ হতে সময় লেগেছিল ১,৮১৫ দিন। ৭০ থেকে ৭৫ টাকা হতে সময় নেয় ৫৮১ দিন। ডলার পিছু টাকার দাম ৭৫ থেকে ৮০ হতে সময় লেগেছিল ৯১৭ দিন ও ৮০ থেকে ৮৫ হতে ৮১৯ দিন। সাম্প্রতিক কালে টাকার দাম ডলার পিছু ৮৫ থেকে ৯০ হয়েছে ৩৪৯ দিনে। ৯০ থেকে ৯৫ হতে সময় লেগেছে ১৫২ দিন। অর্থাৎ সাম্প্রতিককালে টাকার দাম দ্রুততম হারে পড়েছে। ৯৫ থেকে ৯৬ টাকায় পৌঁছাতে মাত্র দু-সপ্তাহ সময় লেগেছে বলে জানাচ্ছে এসবিআই। তাদের রিপোর্ট বলছে, শুধু ডলারের নিরিখেই নয়, টাকার দাম পড়েছে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের নিজস্ব মুদ্রার নিরিখেই। একমাত্র ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রা রুপিয়ার তুলনায় সাম্প্রতিককালে টাকার দাম বেড়েছে ০.৮ শতাংশ। থাইল্যান্ডের ভাটের ক্ষেত্রে টাকার বৃদ্ধির হার ০.১ শতাংশ। বাদবাকি সব ক্ষেত্রেই টাকার দাম পড়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার মুদ্রার তুলনায় টাকার দাম পড়েছে ২.৭ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে ২.৮ শতাংশ, জাপানের তুলনায় ৬ শতাংশ, ব্রাজিলের তুলনায় ৬.৯ শতাংশ। টাকার দামের সঙ্গে জ্বালানির দামের লড়াইয়ে এসবিআই এর আগে তাদের রিপোর্টে জ্বালানির উপর শুল্ক শূন্যে নামানোর জন্য সওয়াল করেছিল। তাতে অবশ্য কর্ণপাত করেনি কেন্দ্র, বরং একমাসে চারবার দাম বাড়িয়ে আম জনতার উপর আর্থিক চাপ বাড়িয়েছ।
প্রশ্ন হল—লোকসানের বহর কমাতে মোদি সরকার কি তেলের দাম আরো এক দফা বাড়াবে? নাকি আমদানি শুল্ক কমিয়ে আম জনতাকে আরো বিপদে ফেলার হাত থেকে রক্ষা করবে তারা?