


সৌম্যজিৎ সাহা, ফলতা: এক কথায় নির্বিষ ভোট। নেই ছাপ্পা, বুথ জ্যামের অভিযোগ। ইভিএমে প্রার্থীর প্রতীকে সেলোটেপ বা আতর ঢালার অভিযোগও নেই। দিনভর চলল শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাপাদাপি। সাঁজোয়া গাড়ি, বাইকে জওয়ানদের টহল, ঘনঘন কিউআরটি দলের আনাগোনা। গরম উপেক্ষা করে উৎসবের মেজাজে মানুষজন এলেন বুথে। তবে যে ভিড় গত ২৯ এপ্রিল বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে দেখা গিয়েছিল, সেটা অবশ্য বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অনেক জায়গায় দেখা যায়নি। ফলতার পুনর্নির্বাচনে এটাই ছিল এদিনের সার্বিক চিত্র। বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডা বুথে বুথে ঘুরলেন। তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান এই ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাই তাঁর উপস্থিতি ছিল না, এমনকী দলের কোনো নেতা-কর্মীকেও রাস্তায় দেখা যায়নি। গোটা বিধানসভায় একমাত্র তাঁর পার্টি অফিসের ছাদে ঘাসফুলের পতাকা উড়ছে। বুথে বুথে নেই ঘাসফুলের এজেন্টও। গোটা ফলতা যেন গেরুয়াময়। পদ্ম পতাকায় মুড়েছে গ্রামের রাস্তা, গোলি থেকে রাজপথ। কোথাও কোথাও উকি দিচ্ছে লাল ঝান্ডা। ভোট দিতে এসেও অনেকেই উগড়ে দিলেন আগের অত্যাচারের কথা। কে কীভাবে ভয় দেখাতেন, উঠে এল সেইসব কাহিনীও। ভোট চলাকালীনই এক তৃণমূল নেতার বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। তাঁকে অবশ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বিরুদ্ধেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে সরব হয়েছিলেন মানুষ। নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, এদিন রাত আটটা পর্যন্ত ফলতায় ৮৭.৯৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। এদিনের ভোটপর্ব নির্বিঘ্নে মিটলেও, সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মির অভিযোগ, ২৭, ২৮ ও ২৯ নম্বর বুথে বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীরা মানুষকে ভোট দিতে বাধা দিয়েছে। বিটার্নিং অফিসারের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ জানানো হয়েছে।
শেষ ১০ বছরে ফলতায় ভোট ঘিরে সাধারণের এই উৎসাহ-উদ্দীপনার ছবি ছিল বিরল। ভোটারদের মধ্যেও যেন অন্যরকম উচ্ছ্বাস। নিজের মতো করে ভোট দিতে পেরে যেন তৃপ্তির অনুভূতি তাঁদের। ভোট দিয়ে ফেরার পথে বিজেপির তরফে কোথাও মুড়ি-ছোলা, কোথাও আবার শরবত, লস্যি এমনকী মিষ্টির প্যাকেট দেওয়া হয়েছে ভোটারদের। যেন উৎসব লেগেছে। ফতেপুর, জালালপুর, শ্রীরামপুর, হরিণডাঙা, বেলসিংহা সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কোনো ভিন্ন ছবি ধরা পড়েনি। এদিন সকাল থেকে অনেক বুথে লাইন দেখা যায়নি। একটু বেলা হতেই অল্প অল্প করে ভোটাররা আসতে শুরু করেন। বহু জায়গায় বয়স্ক ভোটারদের বুথে এসে ভোট দেওয়ার উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। নুয়ে পড়া শরীর নিয়েও ফলতার পুনর্নির্বাচনে অংশ নিতে পিছপা হননি তাঁরা। এমনকী পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে যেসব ৮৫ বছরের ঊর্ধ্বে ভোটাররা বাড়ি বসে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদেরও অনেকে উৎসাহে চলে এসেছিলেন নিজে নিজে বুথে। কিন্তু এই ভোটারদের আর দ্বিতীয়বার ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। অনেক জায়গায় ভোটারদের সংখ্যার চেয়ে বাহিনীর সংখ্যা বেশি ছিল। তবে নিরাপত্তা নিয়ে এবার কোনো খামতি ছিল না। ২৯ শে এপ্রিল যে ভোট ফলতায় হয়েছিল, তখন নিরাপত্তায় অনেক খামতি ছিল বলে দাবি করেন একাধিক ভোটার। এদিন যেভাবে বুথের বাইরে ও ভিতরে জওয়ানরা তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিলেন, তাতে মাছি গলার কোনো সুযোগ ছিল না। নিরাপত্তার খামতি যে ছিল সে কথাও আবার স্বীকার করেছেন কিউআরটি তে দায়িত্বে থাকা বাহিনীর এক অফিসার। তিনি জানান, ওইদিন যে সংখ্যক ফোর্স নিযুক্ত করা হয়েছিল, তা পর্যাপ্ত ছিল না। তবে পুনর্নির্বাচনের জন্য অনেক বেশি সংখ্যক বাহিনী আনা হয়েছে। ফলে নিরাপত্তা একেবারে জোরদার রয়েছে। তবে দিনের শেষে ফলতাবাসীর একটাই কথা, ধমকি, হুমকি, ভয়-ভীতি ছাড়াই অনেকদিন পরে ভোট দিলাম। এটাই তো বড় প্রাপ্তি!