• একদিকে সিস্টেম এবং সিন্ডিকেটের চিরাচরিত সংঘাত। অন্যদিকে পুলিশ বনাম মাফিয়া টক্করের নতুনত্ব। পাশাপাশি বাড়তেই থাকা ভিক্ষাবৃত্তি, শিশু পাচার, স্বাস্থ্য-সামাজিক সংকটের অশুভ আঁতাতের অশনি সংকেত। এই তিনের চুম্বকে রানি মুখোপাধ্যায়ের ‘মর্দানি ৩’ মারকাটারি ব্লকব্লাস্টার গোত্রের না হলেও মনোরঞ্জনে সক্ষম।
পুরানো মোড়কে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো চেনা সামাজিক বৈষম্যের অচেনা অলিগলি নিয়ে লেখা আয়ুশ গুপ্তার টানটান চিত্রনাট্য ও সংলাপ। অ্যাকশন প্যাকড কপ মুভির ফর্মুলার মধ্যেও পরিচালক অভিরাজ মিনাওয়ালার দুই নারীর দ্বন্দ্বকে সামনে রেখে গল্প সাজানোর মুন্সিয়ানায় ‘মর্দানি ৩’ আগের দু’টি থেকে আলাদা।
ছবিতে শিবানী শিবাজি রায় অর্থাৎ রানি মুখোপাধ্যায়ের আগাগোড়া আধিপত্য। অভিনয়ে, অ্যাকশনে, ইমোশনে তিনি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। বিচ্যুতি নেই নায়িকাচিত পর্দা উপস্থিতিতেও। মানবী আর মর্দানির সূক্ষ্ম ফারাকটা এবারেও দক্ষতার সঙ্গে বজায় রেখেছেন তিনি। তারপরেও রানির দিকে তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন মাফিয়া রানি আম্মা ওরফে মল্লিকা প্রসাদ। এই দুই চরিত্রের সমানে সমানে পাল্লা দেওয়ার প্যারামিটারটাই এই ছবির আকর্ষণীয় ফুটেজ। হিন্দি সিনেমার পর্দায় মহিলা ভিলেনের নির্মম, নিষ্ঠুর, নারকীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন মূলত মঞ্চের মেয়ে মল্লিকা। নেগেটিভ ম্যানারিজমের মাত্রাবোধে আম্মা চরিত্রটিকে তিনি গঠন করেছেন এক প্রতিস্পর্ধীর প্রেক্ষাপটে।
পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অর্থের আমদানি হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে। হিসাবহীন সেই আমানতের জোগানদার মূলত শিশু ভিক্ষাজীবীরা। বড় রাস্তার মোড়ে, ট্রাফিক সিগনালের লাল-সবুজ-হলুদ আলোর ফাঁক গলে ঠান্ডা গাড়ির তোলা কাচে আঙুলের উলটো পিঠ ঠুকে ভিক্ষে করা অবাঞ্ছিতের দলের জোগাড়ে জননী এই আম্মারা। গোটা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এদের শিশু সংগ্রাহক শিকারি এজেন্ট। নিম্নবিত্ত পরিবারের পুত্র-কন্যারাই মূল টার্গেট। বুলন্দ শহরের এক প্রভাবশালীর কিশোরী কন্যাকে অপহরণ ঘিরে গণ্ডগোলের সূত্রপাত। রাষ্ট্রদূতের মেয়ে রোহানির সঙ্গে অপহরণকারীরা তুলে নিয়ে যায় ওই আমলার ফার্মহাউসের কেয়ারটেকারের শিশুকন্যা ঝিমলিকেও। নড়ে ওঠে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর। ডাক পড়ে সিনিয়র সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব পুলিশ শিবানীর। সরকারের লক্ষ্য যেভাবেই হোক জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় রোহানি উদ্ধার। তদন্তে নেমে শিবানী আবিষ্কার করে ঝিমলিরাই ‘বেগার মাফিয়া’দের আসল টার্গেট। রোহানি সেক্ষেত্রে ‘মিসটেক’। অথচ এই ঝিমলিদের নিয়ে মাথাব্যথা নেই প্রশাসনের উপর মহলের। এই ছবি আঙুল তোলে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে সরকারের সদিচ্ছার দিকেও। সেই সূত্রে প্রকট হয়ে ওঠে রামানুজনদের মতো সজ্জনের মুখোশ পরা শয়তানের আসল চেহারাটা। রামানুজনের চরিত্রে প্রজেশ কাশ্যপের অভিনয় ছবির আর একটি আকর্ষণ। এহেন ভারী চরিত্রের ভিড়ে শিবানীর স্বামী যিশু সেনগুপ্তর কিছু করার ছিল না।
কিন্তু রানির একার রাজত্বে অনুল্লেখিত থেকে গেল বস্তিবাসী বাবা-মায়েদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর সন্তান হারানোর হাহাকার। শিশুকন্যারাই শুধু অপহৃত হয় না, শিশুপুত্ররাও হয়। সত্তরটি অপহৃত শিশুর মধ্যে তাই দুর্ভাগা বালকরাও থাকতে পারত।
প্রিয়ব্রত দত্ত