সংবাদদাতা, বিষ্ণুপুর: বিষ্ণুপুরের শেষ স্বাধীন মল্লরাজা চৈতন্য সিংহের দেওয়ান থাকাকালীন চণ্ডীচরণ মুখোপাধ্যায় আনুমানিক ২৩৩ বছর আগে জয়পুরের ময়নাপুরে পুজোর প্রচলন করেন। সেই সময় মল্লরাজাদের পুজোর রীতি মেনে ১৫দিন ধরে চলত দুর্গার আরাধনা। তবে আজ মল্লরাজাও নেই। রাজত্বও নেই। নেই দেওয়ানের জমিদারিও। তাই আগের সেই জৌলুস না থাকলেও যেটুকু জমি বেঁচে রয়েছে, তার আয় দিয়েই আজও নিষ্ঠাভরে পুজোর আয়োজন করেন ময়নাপুরের মুখোপাধ্যায় পরিবারের বর্তমান সদস্যরা। পুজোর ক’টা দিন আনন্দে মাতোয়ারা হন তাঁরা।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ময়নাপুরের মুখোপাধ্যায়দের পরিবারের পূর্বপুরুষের বাস ছিল হুগলিতে। পরিবারের সদস্য নিধিকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় জীবিকার সন্ধানে বিষ্ণুপুরের পথে আসার সময় তৎকালীন মল্লরাজাদের দেওয়ান শরোত্তর রায়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পরবর্তীতে দেওয়ান শরোত্তরবাবু তাঁর মেয়ের সঙ্গে নিধিকৃষ্ণর বিয়ে দেন। সেইসঙ্গে নিধিকৃষ্ণকে জয়পুরের ময়নাপুরে থাকার ব্যবস্থাও করে দেন। পরবর্তীকালে বিষ্ণুপুরের শেষ মল্লরাজা চৈতন্য সিংহ নিধিকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র চণ্ডীচরণ মুখোপাধ্যায়ের কর্মদক্ষতা দেখে তাঁকে দেওয়ান পদে নিযুক্ত করেন। সেইসঙ্গে প্রচুর জমি তাঁর হাতে তুলে দেন। পাকা বাড়িও নির্মাণ করেন। জমিদারি মহল তৈরি হয়। চণ্ডীচরণবাবু বিয়ের দীর্ঘদিন বাদে পুত্রসন্তান লাভ করেন। সেই আনন্দে ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কাছারির কাছেই মাটির ঘর তৈরি করে পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে চণ্ডীমণ্ডপ হয়। আগে জিতাষ্টমীর দিন থেকে পুজো শুরু হতো। ছাগল বলি হতো। হ্যাজাকের আলোয় পুজো জমে উঠত। এখন পঞ্চমী থেকে পুজো শুরু হয়। ছাঁচি কুমড়া ও আখ বলি হয়। মুখোপাধ্যায়দের বাড়ির একাধিক সদস্য দেশ, বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছেন। তবে পুজোর ক’টাদিন প্রায় সবাই গ্রামে আসেন। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, এক চালার উপর সাবেকিয়ানা বজায় রেখেই প্রতিমা নির্মিত হয়। বাহ্যিক আড়ম্বর কমলেও প্রাচীন রীতি ও আচার বজায় রয়েছে। পরিবারের যে যেখানেই থাকুক না কেন, প্রায় সবাই প্রতি বছর পুজোয় গ্রামে চলে আসেন। চণ্ডীচরণবাবুর পুত্র কালীপ্রসাদবাবু কর্মসূত্রে সিউড়িতে থাকতেন। তিনিও পুজোর সময় গ্রামে উপস্থিত থাকতেন। তিনি মহাপুজোর জন্য যে পুঁথি নিজে হাতে লিখে গিয়েছেন, সেই অনুযায়ী আজও পুজো হয়।
ষষ্ঠীতে দেবীর বোধনের পর সপ্তমীতে হাকন্দপুষ্করিনীতে নবপত্রিকা স্নান হয়। ওইদিন যে হোমযজ্ঞ হয় তা নবমীতে পূর্ণাহুতির মধ্যে দিয়ে শেষ হয়। এছাড়াও অক্ষয় প্রদীপ জ্বলতে থাকে। সন্ধিপুজোয় ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। একসময় চণ্ডীমণ্ডপ সংলগ্ন আটচালা যা ‘বাবুদের পাঠশালা’ নামে পরিচিত ছিল, বর্তমানে সেখানেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।