সংবাদদাতা, রামপুরহাট: বাংলার দুর্গাপুজো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে অনেকটাই। থিমপুজোর দিকে আগ্রহ বাড়ছে। তার মধ্যেও সাবেকি রীতি মেনে বনেদি বাড়িগুলিতে পুজো হয়। কুণ্ডলা গ্রামের জমিদারবাড়ির পুজো অন্যতম। জমিদারি নেই, কিন্তু সেই মেজাজ রয়ে গিয়েছে। ঐতিহ্য মেনে আজও অষ্টমীর সন্ধি তিথিতে বন্দুকের গুলি ছুড়ে শুরু হয় ময়ূরেশ্বরের কুণ্ডলা গ্রামের জমিদার বাড়ির পুজো। জনশ্রুতি রয়েছে, ওই সন্ধিক্ষণেই মা দুর্গা ত্রিশূল হাতে অসুর বধ করেন। তখন অশুভ শক্তির বিনাস ঘটে, জাগ্রত হয় শুভ শক্তি।
জমিদার প্রভুরাম মুখোপাধ্যায় ও তাঁর ছেলে হাঁটুরাম মন্দির বানিয়ে মৃন্ময়ী মূর্তির উপর দেবীর আহ্বান শুরু করেন। এরপর প্রায় তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই পুজো চালিয়ে আসছেন তাঁর বংশধররা। আজও সেই প্রাচীন মন্দির রয়েছে। শুধু কড়ি বর্গার ছাদ সংস্কার করা হয়েছে। তবে মন্দিরের প্রাচীন চেহারার কোনও বদল করা হয়নি। এখানে বৈষ্ণব মতে পুজো হয়। ষষ্ঠীতে মায়ের বোধন হয়। সপ্তমীতে শোভাযাত্রা সহকারে পাশের ইঁন্দুরিপাড়া গ্রামের মুখোপাধ্যায় পরিবারের পুকুরে নবপত্রিকা স্নানের পর দোলা করে নিয়ে আসা হয়। তৎকালীন সময়ে গ্রামবাসীদের কাছে জমিদার বাড়ির সন্ধিপুজোর শুরুর বার্তা পৌঁছতেই শূন্যে গুলি ছোড়ার রেওয়াজ চালু হয়েছিল। এখনও সেই রীতির কোনও বদল ঘটেনি।
বর্তমান বংশধর সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলেন, পুজোর চারদিন মাকে নানারকম ভাজা দিয়ে অন্নভোগ দেওয়া হয়। বৈষ্ণবমতে পুজো হলেও নবমীর দিন পাশের সর্বমঙ্গলা মন্দিরে ছাগ বলিদান দেওয়া হয়। আগে নবমীর দিন হাজার হাজার মানুষকে পাত পেড়ে অন্ন ভোগ খাওয়ানো হতো। এখন সেই সংখ্যাটা অনেকটা কমে এসেছে। এই পুজোর আরও বিশেষত্ব হল, জমিদার আমল থেকেই মূর্তি গড়া, ঢাকি, পুরোহিত একই বংশের লোক।
প্রায় ২০০ বছর আগে শরিকি বিবাদে এই পুজো মেজ ও ছোট তরফে ভাগ হয়ে যায়। সেখানেও পুজোর নিয়ম কিন্তু একই। তবে, সন্ধিপুজোর বন্দুকের গুলি ছোড়ার নিয়ম বহাল রেখে চলেছে বড় তরফ। আগে এই তিন দেবীর বিসর্জনে কোনও বাহারি আলোর ব্যবহার হতো না। এখন অবশ্য ব্যবহার হয়। দশমীর দিন তিন তরফের দেবীকে গ্রামবাসীরা কাঁধে করে ইঁদুরিপাড়া গ্রামের পুকুর সংলগ্ন জায়গায় নিয়ে আসেন। সেইসময় কয়েক হাজার মানুষ বিসর্জনের শোভাযাত্রায় অংশ নেন। প্রচুর আতসবাজি পোড়ানো হয়। এরপর নিজ নিজ পুকুরে তিন দেবীমূর্তিকে বিসর্জন দেওয়া হয়।
কালের নিয়মে পুজোর জৌলুস হারালেও জমিদারের বর্তমান প্রজন্ম সাধ্যমতো পুজোর আয়োজন করে চলেছেন। শুধু গ্রামেরই নয়, ওই পুজোয় যোগ দিতে চলে আসেন আশপাশের এলাকারও মানুষ। যারা কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন, তাঁরা এই সময় গ্রামে ফিরে আসেন। জমিদার আমলে প্রতিষ্ঠিত দুর্গাদালান পুজোর কয়েকটা দিন মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়।
গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, আশপাশের এলাকায় আরও কয়েকটি পুজো হলেও জমিদার বাড়ির পুজোর মাহাত্ম্যই একে সবার থেকে আলাদা করে দেয়।