


বিশেষ নিবন্ধ, পি চিদম্বরম: সরকার এবং বিজেপি ‘সংবিধান (১৩১তম) সংশোধনী বিল, ২০২৬’-কে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ বয়ান বা আখ্যান তৈরির চেষ্টা করেছিল। সেই বয়ানটি ছিল গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ: এটি ছিল বিকৃত তথ্য এবং আইনের সন্দেহজনক ব্যাখ্যার উপর ভিত্তিতে রচিত।
২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল আইনটি ছিল স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ। সংবিধানের (১০৬তম) সংশোধনীটি পাস হয়েছিল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এবং সেটি হয়ে উঠেছিল ভারতের সংবিধানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ৩৩৪(ক) অনুচ্ছেদটি যুক্ত করা হয়। তবে কেবল সরকারই জানে কোন অজ্ঞাত কারণে এমন একটি সংশোধনী তখন আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিফায়েড বা বিজ্ঞাপিত হয়নি। (অবশ্য ১৬ এপ্রিল রাতে এটি সম্পর্কে
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়)। এই সংশোধনীতে লোকসভার বর্তমান সদস্য সংখ্যার (৫৪৩ জন সদস্য) ভিত্তিতে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছিল। নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিষয়টি একটি মীমাংসিত সত্য হিসাবে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। তাই ৩৩৪(ক) অনুচ্ছেদটি পুনরায় খতিয়ে দেখার বা পর্যালোচনার কোনো অবকাশই ছিল না। এর বিপরীতধর্মী যে বয়ানটি প্রচার করা হচ্ছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তবে, সরকার একটি দুরভিসন্ধিমূলক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল, যা শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে একাধিক উদ্দেশ্য সাধনে সহায়ক বলে মনে হয়েছিল: তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনি প্রচারে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা; সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ‘সীমানা পুনর্নির্ধারণের’ (ডিলিমিটেশন) একটি অলীক বিভ্রম তৈরি করা; এমন একটি সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে কৌশলে ঢুকিয়ে দেওয়া যা দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রতি চরমভাবে অন্যায় ও অবিচারমূলক হবে; এবং এই মিথ্যা বয়ানটি ছড়িয়ে দেওয়া যে, ‘আসন সংরক্ষণের’ বিষয়টি 'সীমানা পুনর্নির্ধারণের' সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। যখন এই প্রতিটি উদ্দেশ্যই একে একে খোলসা হয়ে গেল, তখন সরকারের সেই বয়ানটি তাসের ঘরের মতোই ধসে পড়ল।
সরকার এবং বিজেপি নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে বাধ্য:
১. মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের বিষয়টি আপনারা কেন ফের আলোচনার জন্য উত্থাপন করলেন?
এই প্রশ্নটির সুরাহা তো আগেই হয়ে গিয়েছিল—সংবিধানের (১০৬তম) সংশোধনী আইনের মাধ্যমে, যার ফলে সংবিধানে ৩৩৪(ক) অনুচ্ছেদটি যুক্ত হয়েছিল। ৩৩৪(ক) অনুচ্ছেদটির মধ্যে ঠিক কী ত্রুটি ছিল? ৩৩৪(ক) অনুচ্ছেদটি বাস্তবায়নের পথে আপনারা ঠিক কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন? আপনারা কেন সাধারণ মানুষের মনে—এবং বিশেষ করে মহিলাদের মনে—সন্দেহ ও বিভ্রান্তির বীজ বপন করলেন যে, তাঁদের জন্য আসন সংরক্ষণের প্রক্রিয়াটিতে বুঝি এখনো কোনো অসম্পূর্ণ কাজ বাকি রয়ে গিয়েছে? ৩৩৪(ক) অনুচ্ছেদটি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ। সেখানে নতুন করে করার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
২. ১৬-১৮ এপ্রিলের মধ্যে সংসদের উভয় কক্ষের অধিবেশন ডাকার পিছনে আপনাদের এমন ভয়ানক তাড়াহুড়ো বা ব্যস্ততা কেন ছিল?
তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটগ্রহণের তারিখ হিসেবে ২৩ এপ্রিল (এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ২৯ এপ্রিল) ঘোষণা করা হয়েছিল। মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থা কেবল নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ‘ডিলিমিটেশন’ সম্পন্ন হওয়ার পরেই কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। দেশজুড়ে সীমানা পুনর্নির্ধারণের এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কয়েকমাস—এমনকি কয়েকবছরও লেগে যাওয়ার কথা। যে প্রথম লোকসভা নির্বাচনে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হবে, সেটি হল ২০২৯ সালের নির্বাচন। এমনকি যদি সংবিধানের ৩৩৪(ক) অনুচ্ছেদটি সংশোধন বা পরিমার্জন করার প্রয়োজনও হত—যা অবশ্য প্রয়োজন ছিল না—তবুও ২৬ এপ্রিল, ২০২৬-এর পরে সংসদের উভয় কক্ষের অধিবেশন ডাকার জন্য হাতে যথেষ্ট সময় ছিল। ১৬ এপ্রিল সংসদ সদস্যদের (এমপিদের) তলব করার এবং এর মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারে ব্যাঘাত ঘটানোর কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না; অথচ সেইসময়ে তামিলনাড়ুর ৩৯ জন এবং পশ্চিমবঙ্গের ৪২ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনি প্রচারে পুরোপুরি ব্যস্ত ছিলেন। এই ‘জরুরি অবস্থা’টি ছিল সম্পূর্ণ কৃত্রিম বা মনগড়া, এবং এর মাধ্যমেই সরকারের কালো হাঁড়িটি ভেঙে পড়ে হাটের মাঝেই!
৩. লোকসভার সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির এবং ফলস্বরূপ প্রতিটি রাজ্যের জন্য নির্ধারিত আসন সংখ্যার ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার কী দরকার ছিল?
কোনো ব্যক্তি বা কোনো রাজনৈতিক দলই লোকসভার সদস্যসংখ্যা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করার দাবি জানায়নি। বস্তুত, এই প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে সর্বস্তরেই তীব্র বিরোধিতা ছিল। লোকসভায় সদস্য সংখ্যা বেড়ে ৮১৫ জনে দাঁড়ালে সংসদ কক্ষটি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও অগোছালো হয়ে পড়বে এবং সংসদ সদস্যদের পক্ষে গঠনমূলক অবদান রাখার সুযোগও অনেক কমে যাবে। এর পিছনের আসল উদ্দেশ্যটি ছিল একটি বিভ্রম বা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা—এই মর্মে যে, লোকসভায় প্রতিটি রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং এর ফলে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যাও ১৮১ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৭২-এ উন্নীত হবে। যদিও প্রতিটি রাজ্যের এমপিদের প্রকৃত সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, তবুও লোকসভায় প্রতিটি রাজ্যের আপেক্ষিক গুরুত্ব বা আনুপাতিক শক্তি অপরিবর্তিতই থেকে যাবে। তথাপি, এমন একটি বিভ্রম সৃষ্টি করা হবে যেন লোকসভায় প্রতিটি রাজ্যের প্রতিনিধিত্বের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, সরকার (এবং বিজেপি দল) এমনটিই ভেবেছিল যে, দেশের সাধারণ মানুষ এতটাই অজ্ঞ ও নির্বোধ যে তারা এই ভ্রান্ত ধারণাটি সহজেই বিশ্বাস করে নেবে।
৪. ‘সংবিধান (১৩১তম) সংশোধনী বিল,
২০২৬’ নির্বিশেষে—অর্থাৎ বিলটি পাশ হোক বা না হোক—সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়ার ফলাফল বা প্রভাব কী হবে?
যতদিন পর্যন্ত সংবিধানের ৮১(২)(ক) অনুচ্ছেদটি অপরিবর্তিত থাকবে, ততদিন পর্যন্ত নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজটি অবশ্যই ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট’—এই মূলনীতির ভিত্তিতেই সম্পন্ন করতে হবে। প্রতিটি লোকসভা নির্বাচনি এলাকায়, যথাসম্ভব, ভোটার সংখ্যা সমান রাখার বিধান রাখা হয়েছিল। এর অনিবার্য ফলাফল হিসাবে, যেসব রাজ্যে জনসংখ্যা স্থিতিশীল হয়েছে—সেখানে আসনের সংখ্যা হ্রাস পাবে; অন্যদিকে, যেসব রাজ্যে ‘মোট প্রজনন হার’ (টিআরএফ) জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি—সেখানে আসনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দক্ষিণের পাঁচটি রাজ্য, যাদের লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব ২৪.৩ শতাংশ থেকে কমে ২০.৭ শতাংশে নেমে আসবে। এর বিপরীতে, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোর সম্মিলিত অংশীদারিত্ব প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। সমস্যার মূল জায়গাটি ঠিক এখানেই। এই সমস্যার সমাধান কেবল তখনই সম্ভব, যদি এমন একটি ন্যায্য ও ন্যায়সংগত সূত্র উদ্ভাবন করা যায়, যা সংবিধানের ৮১(২)(ক) অনুচ্ছেদের একটি বিকল্প হিসাবে কাজ করবে। সরকার কিংবা বিজেপির কেউই এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বা সমাধানের উদ্যোগ নিতে আগ্রহী নয়।
৫. সরকার কেন ‘মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের’ বিষয়টিকে ‘সীমানা পুনর্নির্ধারণের’ (ডিলিমিটেশন) সঙ্গে যুক্ত করতে এতটা মরিয়া ছিল?
কারণ, এর মাধ্যমে একটি ভ্রান্ত বা কৃত্রিম বয়ান (ন্যারেটিভ) তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। এই দুটি বিষয়কে অবশ্যই একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন বা স্বাধীন রাখতে হবে।
৬. বিরোধী দলগুলি কেন সংবিধান সংশোধনের প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করল?
২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের লড়াইটা দানা বেঁধেছিল মূলত ‘সংবিধানের সামনে বিপদ’ নামক এজেন্ডার উপর ভিত্তি করেই। ‘সংবিধান (১৩১তম) সংশোধনী বিলটি’ সেই আশঙ্কাগুলিকেই ফের জাগিয়ে তুলেছিল। সৌভাগ্যবশত, বিলটি পরাজিত হয়েছে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত