


মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের গনগনে আঁচ সোজা এখন মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে। গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কোটি কোটি ভোটাররাই বাংলার রাজনীতির উপজীব্য। অতএব যুদ্ধের আঁচ নিয়ে আকচাআকচিতে মত্ত যুযুধান রাজনৈতিক দলগুলিও। একে অপরকে বিরোধিতার রাজনীতিই বাংলার বারোমাস্যা। তাতে সোনায় সোহাগা বিধানসভা নির্বাচনের নৈকট্য। স্বাস্থ্যকর জ্বালানি সমস্ত ভারতবাসীর অধিকার। কাঠ বা কয়লার উনুনে রান্না শুধু বাতাসকেই দূষিত করে না, গৃহিণী থেকে শিশুসহ পরিবারের অনেকের স্বাস্থ্যহানিরও কারণ। সুস্থ জীবনযাপনের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রসংঘ স্বাস্থ্যকর জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। ওই সূত্রেই ১০০ শতাংশ পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান এবং রান্নার গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহের প্রকল্প নিয়েছে সরকার। মোদি সরকারের দাবি, সৌভাগ্য যোজনা মারফত বাংলার ১০০ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং উজ্জ্বলা যোজনায় এলপিজি গ্যাস পাচ্ছে ১ কোটি ২০ লক্ষ পরিবার। দিল্লির দাবির সঙ্গে বাস্তবের মিল সম্পর্কে প্রশ্নের অবকাশ আছেই। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, তর্কের খাতিরে, সত্য ধরে নিলেও মানতে হবে যে, হালফিল যুদ্ধপরিস্থিতিতে গৃহস্থের হেঁশেল স্বস্তিতে নেই। চাল ডাল তেল মশলা সবজি দুধ ডিম থেকে মাছ মাংস প্রায় সমস্ত জরুরি জিনিসই আজ অগ্নিমূল্য। চড়া দামের জিনিসে সংসার চালাতে গিয়ে কমবেশি সকলেই আর্থিক সংকটে রয়েছে। তার মধ্যে আচমকা বাড়িয়ে দেওয়া হল রান্নার গ্যাসেরও দাম। শুধুই দামই বাড়ানো হয়নি, গ্যাসের সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।
আমেরিকা-ইজরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ বাধতেই অনেকে শঙ্কিত ছিল এই ভেবে যে, এর বিরূপ প্রভাব ভারতবাসীর হেঁশেলে এসে পড়বে না তো? রান্নার গ্যাসের জোগান স্বাভাবিক থাকবে তো? যুদ্ধ মাত্র দিনকয়েক গড়াতেই সেই আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হল। সিলিন্ডার প্রতি গ্যাসের দাম ইতিমধ্যেই ৬০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শনিবার থেকে কলকাতাসহ রাজ্যের নানা স্থানে মিলল অন্য আতঙ্কের প্রতিফলন। রাজ্যে গ্যাসের দোকানের সামনে শুরু হল লম্বা লাইন। আগেভাগে সিলিন্ডার তুলে রাখার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে। কিছু গ্রাহকের ভিতরে তুমুল বিভ্রান্তি সার্বিক পরিস্থিতিকে করে তুলেছে আরো জটিল। কারণ, গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে নির্দেশ এসেছে—একটি সিলিন্ডার ডেলিভারি থেকে পরবর্তী নতুন বুকিংয়ের মধ্যে ব্যবধান থাকতে হবে অন্তত ২৫ দিনের! কিন্তু সাধারণ মানুষের উদ্দেশে সরকার বা প্রশাসনের তরফে এনিয়ে কোনো বার্তা বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অনেকে ফোনের মাধ্যমে (মিসড কল বা আইভিআরএস) সিলিন্ডার বুকিং করতে পারেননি। কিছু গ্রাহক পুরানো পদ্ধতিতে বুকিং করতে না-পারায় আতঙ্ক বহুবর্ধিত হয়েছে। সকাল সকাল তাঁরাই উদ্বেগের সঙ্গে ছুটে গিয়েছেন ডিস্ট্রিবিউটরের অফিসে। অনেক গ্রাহকের আশঙ্কা, এই নয়া ফরমানে তাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে না তো? একজন সাধারণ গ্রাহকের বছরে ২১৫ কেজি গ্যাস পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেক্ষেত্রে তিনি বছরে সর্বাধিক ১৫টি সিলিন্ডার পেতে পারেন। তাই প্রশ্ন, ২৫ দিন ব্যবধানের নিয়ম চালু থাকলে গ্রাহকের সেই অধিকার রক্ষিত হবে কীভাবে?
পরে আর গ্যাস পাওয়া যাবে না, এমন আতঙ্কেই বহু গ্রাহক তড়িঘড়ি বুকিং নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। শুক্রবার থেকে ফোনে তাঁদের শোনানো হয়েছে, ‘নাম্বার ডাজ নট এগজিস্ট’! অনেকের মতে, গ্যাসের দোকানের সামনে এমন দীর্ঘ লাইন শেষবার দেখা গিয়েছিল বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে বুকিং চালু হওয়ার সময়। লাইনে দাঁড়ানো গ্রাহকদের ক্ষোভ, তাদের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র তেল বা গ্যাস সংস্থাকে জানিয়েই দায় সারতে চাইছে সরকার। অন্যদিকে, অন্ধকারে রয়ে গিয়েছে সাধারণ মানুষ। তাই যদি কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে তার দায় গ্রাহকের নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের। দায় ঝেড়ে ফেলার দিল্লির নীতিকেই এজন্য দায়ী করা যায়। কেবল উজ্জ্বলা প্রকল্পের গ্রাহকদের জন্য ইকেওয়াইসি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ গ্রাহককেও ইকেওয়াইসির ঝামেলায় ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ আসছে। এই হয়রানিতে তিতিবিরক্ত বহু গৃহস্থ। দাম বাড়ানো হয়েছে বাণিজ্যিক গ্যাসেরও। দুর্ভোগ আছে আরো। সাধারণত গ্যাস বুকিং করার দু-একদিনের মধ্যেই সিলিন্ডার ডেলিভারি পাওয়া যায়। এখনই সেটা চার থেকে ছয়দিনে পৌঁছে গিয়েছে। সমস্যাটি অদূর ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধির আশঙ্কায় সকলে। সাধারণ মানুষকে হঠাৎ বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়ে সরকার নির্বিকল্প সমাধিতে যেতে পারে না। গ্যাসের দাম সাধারণের সাধ্যের মধ্যে রাখার পাশাপাশি সিলিন্ডার সরবরাহ নিয়মিত করার দায়িত্বও নিতে হবে সরকারকে। যুদ্ধপরিস্থিতির চাপ সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। কারণ মোদি সরকারের সৌজন্যে বারো বছর যাবৎ বারো মাসই তারা দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে কাটাচ্ছে।