রামকুমার আচার্য, আরামবাগ: ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন’—অতি পরিচিত এই প্রবাদটির বাস্তবতার সঙ্গে যেন জড়িয়ে রয়েছে আরামবাগের হাটবসন্তপুরে ঘোষাল বাড়ির পুজো প্রচলনের ইতিহাস। বংশের এক সিদ্ধপুরুষ মহামায়ার স্বপ্নাদেশে চিতভস্মের ছাই উড়িয়ে পেয়েছিলেন ‘অমূল্য রতন’— নথ ও নোয়া। আজও সেই ইতিহাস ঘোষালবাড়ির উমার হাতে বহমান। এলাকায় জনশ্রুতি, ‘আগুনখাকির নথ ও নোয়া’ নামে।
কেন ‘আগুনখাকি’? এর পিছনেও রয়েছে একটি ইন্টারেস্টিং ঘটনা। আরামবাগের হাটবসন্তপুরে ঘোষাল বাড়ির পুজো কয়েকশো বছরের প্রাচীন। ঘোষাল বাড়ির সদস্যরা বলছিলেন, ‘এক সময় তাঁদের পরিবারে এক সাধক ছিলেন। নাম রামানন্দ। তাঁর স্ত্রী গোসাঁইমনি নামে পরিচিত। নিঃসন্তান দম্পতি। রামানন্দই দুর্গা পূজার প্রচলন শুরু করেন। তিনি দেহ রাখার সময় তাঁর চিতায় গোসাঁইমনিও ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারপর কেটে যায় কয়েকটা বছর। পুজোও চলতে থাকে স্বাভাবিক নিয়মে। হঠাৎ একরাতে বংশেরই আর এক সাধক কৃষ্ণকান্ত তর্কবাগিশকে স্বপ্নে দেখা দেন মহামায়া। সেই স্বপ্নে তিনি নির্দেশ পান শ্মশানে গিয়ে চিতাভস্ম খুঁড়ে দেখার। কৃষ্ণকান্ত আর দেরি করেননি। নির্দেশ পালন করে পান নথ ও নোয়া। দুর্গা প্রতিমায় ওই নথ ও নোয়া পরিয়ে পুজো করার নির্দেশও স্বপ্নে পেয়েছিলেন কৃষ্ণকান্ত।’ তারপর থেকেই প্রতি বছর ওই নথ ও নোয়া পরিয়ে দেবীর পুজো করে আসছে ঘোষাল বাড়ি। পরিবারের সদস্যদের দাবি, ‘গোসাঁইমনিই মানবী রূপে তাঁদের বংশে এসেছিলেন। পরে তিনিই চিন্ময়ী রূপে স্বপ্নে ধরা দিয়েছেন।’ সপ্তমীর সকালে পরিবারের সকলের উপস্থিতিতে দেবীর প্রতিমায় নথ ও নোয়া পরানো হয়। ঘোষাল বাড়ির সদস্য শৈলেন ঘোষাল শুক্রবার বলছিলেন, ‘আমাদের বাড়ির দুর্গা পুজোয় এখনও সাধক রামানন্দ ও গোসাঁইমনির নামে সংকল্প করা হয়। একইসঙ্গে আগুনখাকির নথ ও নোয়া নামেই পরিচিত ওই অলংকার। সেগুলি যত্নে রাখা হয়। বছরের পর বছর ধরে আমরা এই রীতি পালন করে আসছি। ঘোষাল বাড়ির সদস্যই প্রতি বছর দুর্গা পুজোয় পুরোহিত।’পরিবারের আর এক সদস্য বলরাম ঘোষাল বলেন, ‘আমাদের বাড়ির পুজোয় প্রতিমার বংশ পরম্পরায় শিল্পী গড়ে আসছেন। ঢাকি হিসেবেও রয়েছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। একচালার প্রতিমায় দেবীর আরাধনায় কোনো ত্রুটি রাখা হয় না। পরিবারের সদস্যদের পালা করে পুজো হয়।’ ঘোষাল বাড়ির সদস্যরা জানিয়েছেন, দেবীর পুজোয় ভোগ হিসেবে অষ্টমীতে ভাত, খিচুড়ি, পায়েসের সঙ্গে মাছ দেওয়া হয়। বলি প্রথাও রয়েছে। ছাগের সঙ্গে শশা, ছাঁচিকুমড়ো প্রভৃতি বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে। জনশ্রুতি, এক সময় দুর্গাপুজোর সময় মন্দিরের সামনে বন্যার জল জমে ছিল। কিন্তু সাধক দেবীর কাছে বলি দেওয়া চিন্তিত ছিলেন। আচমকা তিনি দেখেন, জমাজল আর নেই। আনন্দে আত্মহারা বলিদান করেন তিনি। ঘোষালবাড়িতে দশমীতেই প্রতিমা বিসর্জন হয়। -নিজস্ব চিত্র