অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: বাতাসে শিউলি গন্ধ, আকাশ ঘন তুলোট মেঘের ক্যানভাস। পুজোর প্রকৃতি তৈরি। সেই সঙ্গে সেজে উঠতে শুরু করেছে শহর চুঁচুড়া। বাঙালির দুর্গাপুজো বহুবছর ধরেই থিম নির্ভর হয়ে উঠেছে। বাহারি থিমের চমক তাই এবারও চুঁচুড়ার পুজোর মুখ্য আকর্ষণ। সদর চুঁচুড়া থেকে ব্যান্ডেল, পুজো মণ্ডপে এখন বাহারি সাজের রোশনাই। প্রতিমা থেকে মণ্ডপসজ্জা, সবেতেই চোখধাঁধানোর জোরালো আয়োজন। কারও থিমের নাম স্নিগ্ধতা, তো কোথাও পুজোর সাবেক স্মৃতি ফেরানোর তাগিদে থিমের নাম স্মৃতি। আর শারদোৎসব মানেই প্রকৃতি থেকে মানুষের নিবিড় আনন্দযজ্ঞ। সেই ভাবনাকেই সাকার করে ব্যান্ডেল থিম সাজছে আনন্দযজ্ঞ নামে। কয়েকদিন ধরেই আকাশও উমার আগমন সংকেত পেয়ে শান্ত। তাই চুঁচুড়াতে পুজো মণ্ডপ সাজানোর কাজও গতি পেয়েছে।
৩৩ বছরে পা দিয়েছে চুঁচুড়ার পঞ্চাননতলা সর্বজনীন। তাদের এবারের থিম দেব ও মানব সম্পর্কের অনুভূতি। দেবতার সামনে মানব মনের যে স্নিগ্ধতার বিস্ফোরণ হয় তাকেই বাস্তবের মাটিতে তুলে ধরতে চাইছেন উদ্যোক্তারা। স্নিগ্ধতার একমাত্র প্রাকৃতিক রূপকল্প চাঁদ। তাই চন্দ্রের আবহেই ধরা হয়েছে দুর্গার অবয়বকে। কলকাতার শিল্পীকে এনে প্রতিমাতে বিশেষ চমক রাখার আয়োজন করা হয়েছে। অনুভূতিপ্রবণ থিম তাই মণ্ডপসজ্জা অনেকটাই নির্দিষ্ট কাঠামোহীন। প্রকৃতি, মানুষ ও মানবজীবনের জটিলতাকে বর্ণময় ভঙ্গিমায় ধরার চেষ্টা দর্শকরা দেখতে পাবেন। এমনটাই দাবি উদ্যোক্তাদের। ক্লাবকর্তা অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় বলেন, আলোকসজ্জাকেও থিমের আদলে সাজানো হচ্ছে। দেবতা ও মানুষের সম্পর্কের অনুভূতিকে আমরা কাঠামোয় ধরার কাজ করছি। আশা করছি দর্শকদের ভালোবাসা মিলবে।
দেব ও মানব সম্পর্কের এক ভিন্ন রসায়নকে ধরার প্রয়াস করেছে ব্যান্ডেলের অরুণ উদয় সঙ্ঘ। দেবীপ্রতিমা থেকে মণ্ডপসজ্জা সবেতেই শিশুর সারল্যকে ধরে রাখার প্রয়াস করা হয়েছে। থিমের নাম, আনন্দযজ্ঞ। উৎসব মরশুমে শিশুর আনন্দই পবিত্রতম। সেই ভাবনার জেরে দেবী সপরিবারে হাজির হবেন পুতুল কাঠামো নিয়ে। সিংহের গড়নেও হিংস্রতার বদলে এসেছে আক্রোশহীন শিশুভাব। আকারে বড়ো কিন্তু পুতুল প্রতিমার আদল অনবদ্য সাজে সাজছে। মণ্ডপসজ্জাতে বিপুল সংখ্যক পুতুল মানব মডেল ব্যবহার করা হবে। আলোকসজ্জাতে থিমের অনুসরণের পাশাপাশি কিছুটা সাবেক ধারাকে ফেরাতে মাটির প্রদীপের মতো আলোকসজ্জা ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছেন উদ্যোক্তারা। ক্লাবকর্তা তীর্থপ্রতিম মিত্র বলেন, একটি ভিন্ন রকমের প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জা আমরা দেখানোর উদ্যোগ নিয়েছি। ৬৬ বছরে পা দেওয়া পুজোর ক্ষেত্রে সেটাই আমাদের মুখ্য চমক।
পুতুল বললেই মনে আসে বাংলার পুতুলশিল্পের কথা। মনে আসে কুটিরশিল্প, পটচিত্র, দারুশিল্পের কথা। সেসবকে আশ্রয় করেই পুরনো দিনের পুজোর আয়োজনকে ফিরে দেখানোর উদ্যোগ নিয়েছে চুঁচুড়ার বাবুগঞ্জ সর্বজনীন। থিমের নাম তাই, স্মৃতি। ক্লাবকর্তা জয়দেব অধিকারী বলেন, পুরনোর সমাবেশে নতুন পুজোর আয়োজন। আলোকসজ্জাও থাকবে থিমের সঙ্গে মানানসই। টুকরো টুকরো কাপড়ের বর্ণময় সজ্জায় ইতিমধ্যেই সেজে উঠেছে মণ্ডপ। এছাড়াও মণ্ডপের বাইরের থাকবে নানা পুতুলের সমাহার। মণ্ডপের অন্দরসজ্জায় থাকবে পট। দেবীদুর্গার নানা কাহিনি আশ্রয় করে সেসব তৈরি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে পুরনো দিনের দেবীপ্রতিমাকে ঘিরে থাকছে বাঁশের নানা ধরনের হস্তশিল্প। এমনই মোহন নানা আয়োজনের জমাটি সমাবেশ এখন চুঁচুড়ায়।