সংবাদদাতা, তেহট্ট: একসময় পুজোএলেইরাতভর তাঁদের জন্য অপেক্ষা করত গ্রাম। প্যান্ডেলের বাইরে ভিড়, মঞ্চের সামনে উপচে পড়া দর্শক। ঢোল, করতাল আর হারমোনিয়ামের সুরে রাত গড়াত। ‘বিবেক’ গান ধরলেই আসর নিস্তব্ধ হয়ে যেত। রাজা-রানির সাজে মঞ্চে উঠতেন কেউ, কেউ সেনাপতির তর্জন-গর্জনে কাঁপিয়ে দিতেন আসর। নায়িকার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকত দর্শক। সেদিন এখন অতীত। মঞ্চের আলো নিভে গিয়েছে। কিন্তু তেহট্টের প্রবীণ যাত্রাশিল্পীদেরকণ্ঠে এখনও বেঁচে আছে সেই সুর।
তেহট্ট মহকুমার বেতাই, নাজিরপুর, করিমপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছেন এমন বহু প্রবীণ শিল্পী। কারও বয়সের ভারে শরীর আর সায় দেয় না, কারও সংসার চলছে অন্যের জমিতে কাজ করে বা ছোটখাটো ব্যবসায়। অথচ তাঁদের ঘরের এক কোণে এখনও যত্নে পড়ে রয়েছে পুরানো রাজপোশাক, জং ধরা তলোয়ার কিংবা মেকআপের বাক্স। সেগুলিই এখন তাঁদের শিল্পীজীবনের শেষ স্মৃতি।
একসময় যাত্রার ‘বিবেক’ চরিত্রে দাপিয়ে অভিনয় করেছেন বেতাইয়ের ষষ্ঠী বিশ্বাস, অসিত ঘোষ। তাঁদের কণ্ঠে গান শুনতে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন দর্শক। তেহট্টের বাসুদেব সাহা, বেতাইয়ের চণ্ডীচরণ হালদার, অমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, মধুসূদন ঘোষ, করিমপুরেরসুশীলবিশ্বাসদের জীবনেও জড়িয়ে রয়েছে যাত্রার সেই স্বর্ণসময়। তাঁদের কথায়,একসময় রাত জেগে মানুষ আমাদের অভিনয় দেখত। মেকআপ করে মঞ্চে উঠলে মনে হত আমরা যেন সত্যিই রাজা। এখন শরীর চলে না। তার চেয়েও বড়ো কথা, অভিনয়ের সেই কদরও আজ নেই।
শুধু পুরুষ শিল্পীরাই নন, একসময় যাত্রামঞ্চে নায়িকার চরিত্রে দাপিয়ে অভিনয় করেছেন পুতুল হালদার ও দেবী ঘোষের মত শিল্পী। একসময় তাঁদের অভিনয় দেখতে ভিড় জমত। এখন সেই মঞ্চই যেন তাঁদের কাছে দূরের স্মৃতি। পুতুল ও দেবীর আক্ষেপ, উৎসবেরমরশুমে দু-একটি অনুষ্ঠান করলেই যাত্রাশিল্প বেঁচে থাকবে না। নিয়মিত স্থানীয় স্তরে যাত্রার আসর বসানো এবং প্রবীণ শিল্পীদের সম্মান জানানোর প্রয়োজন রয়েছে। প্রাক্তন শিল্পীদের মতে, বিনোদনের ধরন বদলেছে। স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ডিজে-সংস্কৃতির ভিড়ে যাত্রার সেই রাতজাগা আসর অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। সরকারি মেলা বা কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে ডাক মিললেও তা নিয়মিত নয়। ফলে বহু শিল্পী বাধ্য হয়েছেন অন্য পেশায় যেতে। কারও হাতে উঠেছে সবজি বিক্রির ঝুড়ি, কেউ দিনমজুরির কাজে যুক্ত। মঞ্চের হাততালি বদলে গিয়েছে সংসার চালানোর লড়াইয়ে।
স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের বক্তব্য, প্রবীণ শিল্পীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মকে যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পধারাকে নতুন করে ফেরানো সম্ভব।