জ্ঞানং দেবার্চ্চনং ধ্যানং ধারণা নিয়মো যমঃ।
জ্ঞানং দেবার্চ্চনং ধ্যানং ধারণা নিয়মো যমঃ।
প্রত্যাহারঃ সমাধিশ্চ হরিনাম সমং ন চ।।
জ্ঞান, দেবপূজা, ধ্যান, ধারণা, নিয়ম, যম, প্রত্যাহার, সমাধি, হরিনামের সমান নয়।
জ্ঞান, দেবপূজাদি হরিনামের সমান কেন নয়?
জ্ঞান, পরোক্ষ অপরোক্ষ ভেদে দ্বিবিধ। ব্রহ্ম আছেন ইহা জানা পরোক্ষ ব্রহ্মজ্ঞান, আর আমি ব্রহ্ম এর নাম অপরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ব্রহ্মজ্ঞান।
অস্তি ব্রহ্মোতি চেদ্ বেদ পরোক্ষজ্ঞানমেব তৎ।
অহং ব্রহ্মোতি চেদ্ বেদ সাক্ষাৎকারঃ স উচ্যতে।। —পঞ্চদশী
এই জ্ঞান লাভ কর্তে হ’লে সদ্গুরু এবং সৎশাস্ত্রবচনে বিশ্বাস রাখতে হয়; সদ্গুরু দুর্লভ এবং এই দারুণ যুগে সৎশাস্ত্র পাঠ কয়জনার ভাগ্যে সম্ভব হ’তে পারে? সহস্রের মধ্যে একজনও এরূপ সুযোগ পায় কি না সন্দেহ! হরিনাম কর্লে জ্ঞানীর কাম্য যে পরমানন্দ-লাভ, ভক্ত তা অনায়াসে হাসতে হাসতে লাভ করেন। এখানে “জ্ঞান” অর্থে শাস্ত্র ও আচার্য্যের দ্বারা লব্ধ পরোক্ষ জ্ঞান। দেবার্চ্চনার পাঁচটি অঙ্গ—অভিগমন, উপাদান, যোগ, স্বাধ্যায়, ইজ্যা। দেবতার স্থান মার্জ্জন, উপলেপ, নির্ম্মাল্য দূরীকরণের নাম অভিগমন। গন্ধ-পুষ্পাদি চয়নের নাম উপাদান। স্বীয় ইষ্টদেবতাকে আপনার আত্মারূপে ভাবনার নাম যোগ। মন্ত্রার্থ সন্ধানপূর্ব্বক জপ, সুক্ত, স্তোত্রপাঠ, তত্ত্বাদি শাস্ত্রাভ্যাস প্রভৃতিকে স্বাধ্যায় বলে। স্বীয় দেবতার যথার্থভাবে পূজার নাম ইজ্যা। দেবার্চ্চনা কর্তে হ’লে একটি দেবগৃহ, পূজার দ্রব্যাদি প্রয়োজন। সুক্ত, স্তোত্র, শাস্ত্রপাঠ বিদ্বান্ না হ’লে কর্তে পারে না। আমার আত্মাই ভগবান্, এ চিন্তা করবার শক্তি কয়জনার আছে? ইজ্যা—যথার্থভাবে মানসপূজা ও বাহ্যপূজা নিত্য ষোড়শোপচারের দ্বারা করা—এবং কর্বার ধৈর্য্য—ব্রহ্মচর্য্যহীন, যথেচ্ছভোজী, যথেচ্ছাচারী কলির মানুষের পক্ষে কতটা সম্ভব, তা একবার চিন্তা ক’রে দেখ। তাহ’লেই বুঝতে পারবে দেবার্চ্চনাটি বড় সহজ কর্ম্ম নয়। “দেবো ভূত্বা দেবং যজেৎ।” দেবতা হ’য়ে দেবতার পূজা কর্তে হয়। ভূতশুদ্ধি না কর্লে প্রকৃত পূজা হয় না। তাহলেই বোঝ—পূজা করা কত কঠিন। এই পূজা ক’রে পূজক যা লাভ করেন, হরি হরি করলেই নামকারী অতি সহজে সেই আনন্দময়কে লাভ ক’রে থাকেন।
অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য্য, অপরিগ্রহের নাম যম। কায়মনোবাক্যের দ্বারা হিংসা ত্যাগের নাম অহিংসা। বাক্য ও মনের যাথার্থের নাম সত্য। চুরি না করার নাম অস্তেয়। কায়মনোবাক্যের দ্বারা মৈথুন ত্যাগের নাম ব্রহ্মচর্য্য। মাত্র দেহ ধারণের উপযুক্ত ভক্ষ্য ও লজ্জা নিবারণের জন্য বস্ত্র গ্রহণকে অপরিগ্রহ বলে। সর্ব্বত্যাগ করত মাত্র অষ্টাঙ্গ যোগের জন্য নির্জ্জন পর্ব্বত গুহাদি যোগের অনুকূল কোন স্থানে গমন করে, তবে সাধক যম নিয়মাদি সাধন কর্তে সমর্থ হন। শৌচ, সন্তোষ, তপস্যা, ঈশ্বরপ্রণিধানের নাম নিয়ম। বিষয়-বিচরণকারী ইন্দ্রিয়গণকে বলপূর্ব্বক আহরণের নাম প্রত্যাহার। কোন অধ্যাত্ম প্রদেশে বা একটি বস্তুতে চিত্তধারণা করার নাম ধারণা। “তত্র প্রত্যয়ৈকতানতা ধ্যানং”—সে স্থানে অবিচ্ছিন্নভাবে ভগবৎ স্মৃতি প্রবাহের বিস্তারের নাম ধ্যান। জীবাত্মা পরমাত্মার সমতার নাম সমাধি।
শ্রীগুরুপ্রকাশন প্রকাশিত ‘শ্রী ওঙ্কারনাথ-রচনাবলী’ (৩য় খণ্ড) থেকে