


বিশেষ নিবন্ধ,মৃণালকান্তি দাস: ইরানের সামরিক কৌশলের নেপথ্যে রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘অদৃশ্য হাত’!
উত্তর ইরাকের এরবিলে পশ্চিমি বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার পর এমন মন্তব্য করেন ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি। লন্ডনের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ব্রিটেনের সামরিক সদর দপ্তরের অফিসাররা জন হিলিকে জানিয়েছেন, ইরান ও তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলির ড্রোনচালকরা ‘রুশ রণকৌশল’ ব্যবহার করছে। তার প্রমাণ ‘শাহেদ’ ড্রোন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দুই হাজারের বেশি ‘শাহেদ’ ড্রোন ছুড়েছে। এই একই ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে রাশিয়া। ব্রিটিশ জয়েন্ট অপারেশনের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিক পেরি বলছেন, রণাঙ্গনে ইরানি ড্রোনচালকরা এখন ড্রোনগুলি অনেক নীচু দিয়ে ওড়াচ্ছে, যা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং আটকানো বেশ ‘কঠিন’। এতে স্পষ্ট রাশিয়া ইরানকে ড্রোন ব্যবহারে বিশেষ টেকনিক্যাল পরামর্শ দিচ্ছে।
শুধু জন হিলি নন, উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমেরিকার তিন শীর্ষ কর্তা। তাঁরা সংবাদসংস্থা ওয়াশিংটন পোস্ট–কে জানিয়েছেন, রাশিয়া ইরানকে সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্যও দিচ্ছে। এর মাধ্যমে ওই কর্তারা শুধু একটি কৌশলগত জোটের ইঙ্গিত দেননি। তাঁরা সামনে এনেছেন যুদ্ধের এক নতুন বাস্তবতা। এমন এক যুদ্ধ, যার কোনো নির্দিষ্ট ফ্রন্টলাইন নেই। এই যুদ্ধ ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই নয়। এখানে লড়াই হচ্ছে রেডারের তরঙ্গ, স্যাটেলাইটের তথ্য এবং এনক্রিপ্ট করা স্থানাঙ্ক দিয়ে। উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন যুদ্ধক্ষেত্র মূলত তড়িৎচৌম্বক বর্ণালি। দুই পক্ষই চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষের প্রযুক্তিকে অন্ধ করে দিতে। গোয়েন্দা তথ্য এখন একধরনের মুদ্রা। পুতিন কেবল সেই মুদ্রা খরচ করছেন।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র প্রাক্তন অফিসার ব্রুস রিডেল একবার বলেছিলেন, আধুনিক যুদ্ধে অনেক সময় ‘স্থানাঙ্ক’ গোলাবারুদের চেয়েও বেশি মূল্যবান। যে জানে শত্রু কোথায় আছে, শেষ পর্যন্ত জয়ের সম্ভাবনাও তারই বেশি। উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার গোয়েন্দারা ইরানকে এমন নির্ভুলভাবে মার্কিন ও ইজরায়েলি সামরিক অবস্থান নির্ধারণে সাহায্য করছে, যা তেহরানের পক্ষে একা সম্ভব ছিল না। কারণ, ইরানের নিজস্ব সামরিক নজরদারি স্যাটেলাইট খুবই সীমিত। খোলা সমুদ্রে দ্রুতগতির নৌবহর অনুসরণ করার জন্য তা যথেষ্ট নয়। রাশিয়ার ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা নেই। তাদের উন্নত নজরদারি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক রয়েছে। বিশেষ করে কানোপাস-ভি স্যাটেলাইট, যা ইরানে যাওয়ার পর খাইয়াম নামে পরিচিত হয়েছে। কানোপাস-ভি স্যাটেলাইট তেহরানকে দিনরাত অপটিক্যাল ও রেডার চিত্র সরবরাহ করতে পারে। ইরানের জন্য এটি শুধু সামরিক সক্ষমতার একটি সহায়ক উপাদান নয়, বরং নির্ভুল আঘাত হানার কৌশলের স্নায়ুতন্ত্রের মতো কাজ করছে। কুয়েতে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানা ড্রোনটি হঠাৎ করে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায়নি। ওই হামলায় ছ’জন মার্কিন সেনা নিহত হন। পেন্টাগনের কয়েকজন কর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি ইরানি হামলায় সরাসরি আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলি টার্গেট হয়েছে। এমন লক্ষ্যবস্তুর স্থানাঙ্ক সাধারণ কোনো মানচিত্রে পাওয়া যায় না। ফলে তথ্যের উৎস অনুমান করা কঠিন নয়।
ইরান যুদ্ধে চীনের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে নীরব। কিন্তু এই নীরবতার গুরুত্ব কম নয়। কয়েক বছর ধরে চীন ইরানের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা বদলে দিয়েছে। তারা উন্নত রেডার ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে, ইরানের সামরিক নেভিগেশন ব্যবস্থাকে মার্কিন জিপিএস থেকে সরিয়ে চীনের এনক্রিপ্ট করা বাইদু থ্রি স্যাটেলাইট ব্যবস্থায় নিয়ে গিয়েছে। তাদের বিস্তৃত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সংকেত, গোয়েন্দা তথ্য ও ভূখণ্ড মানচিত্র তৈরিতে সাহায্য করছে। দেখা যাচ্ছে, গত বছর জুনে ইজরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানি ড্রোন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় আঘাতের সক্ষমতা অনেক বেশি নিখুঁত হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের জেনারেল ডিরেক্টরেট ফর এক্সটার্নাল সিকিউরিটির প্রাক্তন ডিরেক্টর অ্যালেইন জুইলেট বেসরকারি পডকাস্ট ‘তুকসান’-এ এই মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, ‘এই যুদ্ধের অন্যতম চমক হল, আট মাস আগের যুদ্ধের তুলনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এখন অনেক বেশি নির্ভুল আঘাত হানছে। আর এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির গাইডেন্স সিস্টেম বা লক্ষ্যবস্তু নিশানা করার প্রযুক্তি নিয়ে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।’
অবসরপ্রাপ্ত ইজরায়েলি বিমানবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমোস ইয়াদলিন একবার বলেছিলেন, আধুনিক যুদ্ধে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। যদি ইরান টার্গেট শনাক্তকরণ ও আঘাত হানার সময় কয়েক মিনিট কমিয়ে আনতে পারে, তাহলে আকাশযুদ্ধে শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। চীন কেবল কয়েক মিনিট কমায়নি, তারা পুরো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের প্রক্রিয়াটাই নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে। চীনের সরবরাহ করা ওয়াইএলসি-এইট-বি অ্যান্টি স্টেলথ রেডার কম ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ ব্যবহার করে। এতে মার্কিন স্টেলথ বিমানগুলির রেডার এড়ানোর ক্ষমতা কমে যায়। বি-২১ রেইডার এবং এফ-৩৫সি বিমানগুলিকে রেডারের চোখে প্রায় অদৃশ্য থাকার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু
এই ধরনের রেডারের সামনে তাদের সেই
ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। এটাই এই
যুদ্ধের বাস্তবতা!
১৯৯৬ সালে তাইওয়ান সংকটের পরই চীন নিজেদের স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম তৈরির কাজ শুরু করে। কারণ, তাদের আশঙ্কা ছিল, ভবিষ্যৎ সংঘাতের সময় ওয়াশিংটন হয়তো জিপিএস ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। চীন সরকারের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই নেভিগেশন সিস্টেমের লক্ষ্য হল ‘বিশ্বের সেবা করা এবং মানবজাতির কল্যাণসাধন’। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চীনের এই সিস্টেমে অন্য নেভিগেশন সিস্টেমের চেয়ে অনেক বেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হয়। সংবাদসংস্থা আল–জাজিরার এজে ল্যাবস ডেটা টিমের তথ্য বলছে, মার্কিন জিপিএস সিস্টেমে তথ্য সরবরাহের জন্য ২৪টি স্যাটেলাইট রয়েছে। অন্যদিকে চীনের সিস্টেমটি ৪৫টি স্যাটেলাইটের উপর নির্ভরশীল। বিশ্বের অন্য দু’টি প্রধান নেভিগেশন সিস্টেম হল— রাশিয়ার গ্লোনাস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও। এগুলির প্রতিটিতে ২৪টি করে স্যাটেলাইট রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, ইরান ২০২৫ সালের জুন মাসেই তাদের গোটা ব্যবস্থাকে বাইদুতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে পরিবহণ ও লজিস্টিকসের মতো অসামরিক ক্ষেত্রগুলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১২ দিনের যুদ্ধের ঠিক পরপরই এই পরিবর্তন আনা হয়। ওই যুদ্ধের সময় জিপিএসে ব্যাঘাত ঘটায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের নিশানা ঠিক করা এবং অসামরিক বিমান ও জাহাজ চলাচলে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ফলে ইরান আর মার্কিন জিপিএসের উপর ভরসা রাখতে পারেনি। শুধু স্যালেটাইট প্রযুক্তিই নয়, এই যুদ্ধকালীন আবহেই ইরান চীনের কাছ থেকে ৫০টি সিএম-৩০২ সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করে ফেলেছে। এটি মূলত চীনের ওয়াইজে-১২ ক্ষেপণাস্ত্রের রপ্তানি সংস্করণ। এই ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির তিন গুণ বেগে ওড়ে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছ দিয়ে এগোয়। চীন এই সংঘাতকে বাস্তব যুদ্ধের একটি পরীক্ষাগার হিসেবে দেখছে। যদি কোনো দিন সিএম-৩০২ ক্ষেপণাস্ত্র আমেরিকার কোনো বিমানবাহী রণতরির দিকে ছোড়া হয়, তাহলে সেই লড়াই থেকে পাওয়া তথ্য চীনের সামরিক বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবে। তাদের প্রধান টার্গেট একটিই— তাইওয়ান। তারজন্য নিজেদের সবরকমভাবে প্রস্তুত রাখতে চাইছে বেজিং।
সামরিক বিশ্লেষকরাও এই সিএম-৩০২ সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রকে বিমানবাহী রণতরির জন্য বড়ো বিপদ বলে মনে করছেন। বর্তমানে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পরিসরের মধ্যেই অবস্থান করছে। তবে আমেরিকা ও ইজরায়েল নিষ্ক্রিয় নয়। তারা পালটা অভিযান চালাচ্ছে। মার্কিন ও ইজরায়েলি গোয়েন্দা দল ইরানের নেতৃত্বের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করছে, ইসলামিক রেভেল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কমান্ড কেন্দ্রগুলি চিহ্নিত করছে এবং অপারেশন রোরিং লায়ন ও অপারেশন এপিক ফিউরির শুরুতেই দ্রুত ও নিখুঁত হামলা চালিয়ে ইরানের অনেক রেডার পরিকাঠামো ধ্বংস করেছে বলে দাবি।
ইজরায়েলি বিমানবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান মেজর জেনারেল আইতান বেন এলিয়াহু বলেছেন, রেডার ধ্বংস করা মানে শুধু একটি যন্ত্র নষ্ট করা নয়। এর অর্থ, শত্রুকে অন্ধ করে দেওয়া। যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টাতেই অনেক রেডার ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল। পালটা জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাঈনি দাবি করেছেন,
তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রায় ১০টি উন্নত মার্কিন রেডার ধ্বংস করেছে।
রাশিয়া দেখেছে কীভাবে পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনকে দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য তাদের সামরিক অবস্থান দুর্বল করেছে। ফলে ইরানকে সাহায্য করে আমেরিকাকে উপসাগরীয় এলাকায় চাপে রাখা তাদের কাছে কেবল লেনদেনের বিষয় নয়। এটা কৌশলগত প্রতিশোধও! রাশিয়া ও চীন ইরানের জন্য সেনা পাঠাচ্ছে না। সেই পরিকল্পনাও তাদের নেই। তারা আরও দীর্ঘস্থায়ী কিছু করতে চায়। তারা ইরানকে শেখাতে চায়, ‘আধুনিক যুদ্ধ কীভাবে দেখতে হয়’।
দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল ছিল আমেরিকা ও ইজরায়েলের প্রযুক্তিগত আধিপত্যের ক্ষেত্র। সেই আধিপত্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কিন্তু চীনের সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ এবং রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তার কারণে তা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়েছে। এক শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্তা সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, এখন সংকেতই নতুন বুলেট। যে তড়িৎচৌম্বক বর্ণালি নিয়ন্ত্রণ করে, সে–ই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করে। ইরান তিন দশক ধরে সেই যুদ্ধ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে। তারা দেখেছে, প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল একটি রাষ্ট্রকে কীভাবে আকাশপথ থেকে ধ্বংস করা যায়। রাশিয়ার স্যাটেলাইট তথ্য এবং চীনের রেডার প্রযুক্তি ব্যবহার সেই অভিজ্ঞতারই প্রতিক্রিয়া।
তেহরান চায় না তাদের পরিণতিও একদিন বাগদাদের মতো হোক!