বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: সন্ধিপুজোয় বলি হবে। তার ঠিক আগে শাড়ি পরা এক কুমারী মেয়ে হঠাৎ উপস্থিত হল দুর্গা মণ্ডপে। কয়েক মুহূর্ত হয়ত ছিল। তারপর হঠাৎই উধাও। যেন কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। কিন্তু আশ্চর্য! হাজির থাকার প্রমাণস্বরূপ রেখে গেল দাগ। তার শাড়ির আঁচলের ছাপ দুর্গার মুখমণ্ডলে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল। সকলে এ ঘটনা দেখল। ‘এ হল মায়েরই লীলা’ এই বলে দেবীর আদেশ ভেবে বন্ধ করা হল সন্ধিপুজো। আড়িয়াদহের চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে এরপর শুরু হল ‘কল্যাণী পুজো’।
এরকম ঘটনা একটা নয়। এ বাড়ির এই ‘বুড়ো মা’ নানাভাবে জানান দেন নিজের অস্তিত্ব। মধ্যরাতে নূপুরের আওয়াজ হয়। আচমকা বয়ে যায় সুগন্ধি হাওয়া। পরিবারের সবাই তো বটেই সে গন্ধ টের পায় প্রতিবেশীরাও।
আড়িয়াদহের প্রাচীন নাম ‘আর্যদহ’। এখানকার বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ রাঘবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাপণ্ডিত। তিনি নদীয়ার পাটুলির বাসিন্দা ছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র এই পণ্ডিত ব্রাহ্মণকে আর্যদহে জমি দান করেছিলেন। সপরিবারে থাকতে শুরু করেন ব্রাহ্মণ। তারপর পাটুলির পারিবারিক দুর্গাপুজোটির সূচনা এখানে করেন। পাটুলির সময়কাল ধরা হলে এই পুজো পাঁচশো বছরের পুরনো। আর এখানে ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে পুজো শুরু হয়েছিল। সেই হিসাবে এই পুজো ৩৫২ বছরের পুরনো। বাংলায় বর্গী হানার সময় চট্টোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গা মণ্ডপ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। এরপর পরিবারের সদস্যরা নতুন করে মন্দির ও দুর্গাদালান তৈরি করেন। আজও সেই দালানেই দুর্গার নিত্যপুজো হয়। পঞ্চমীতে হয় বোধন। মৃন্ময়ীকে নতুন বেনারসি পরানো হয়। পাশাপাশি সোনা ও রুপোর অলঙ্কারে সুসজ্জিত করা হয় তাঁকে। তাঁর আরাধনার জন্য জন্য ‘দুর্গাতরঙ্গিনী’ নামে এই পরিবারের নিজস্ব পুঁথি আছে। আরামবাগের সংস্কৃত টোল থেকে ব্রাহ্মণরা আসেন, সেই পুঁথি মেনে দুর্গার আরাধনা করেন।
মহালয়ার দিন থেকে বাড়ির দীক্ষিত মহিলারা ভোগের নাড়ু তৈরি শুরু করেন। ভোগে খিচুড়ি, নানা রকমের ভাজা, তরকারি, ইলিশ ও পোনা মাছের ঝাল, চাটনি, পায়েস ও মিষ্টি থাকে। আজও রীতি মেনে ভোগের শুক্তো তৈরি হয় পলতা পাতা দিয়ে। রাতে শীতল ভোগে থাকে লুচি, সুজি, মিষ্টি, তরকারি। আগে পুজোর তিনদিন ছাগবলি দেওয়া হত। ২০১০ সাল থেকে বলিদান বন্ধ। বর্তমানে আখ, চালকুমড়ো ও কলা বলি হয়। দশমীর দিন সিদ্ধি ও হলুদগোলা জলে দুর্গার পায়ের ছায়া দেখে পরিবারের সবাই। তারপর অঞ্জলি সমাপনে দধিকর্মা করে। এই পরিবারের শ্যামল চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘শুনেছি বর্গীরা দুর্গাদালান, বাড়ি সহ সমস্ত কিছু তছনছ করে দিয়েছিল। দেবীমূর্তিও ভেঙেছিল। সেবার পুজো নিয়ে সকলেই চিন্তায় ছিলেন। কিন্তু মা পরিবারের সদস্যদের নির্দেশ দিয়ে নিজের পুজো নিজেই করিয়ে নিয়েছিলেন। কলসির মধ্যে ঘট রেখে সেবার পুজো হয়েছিল। মা খুব জাগ্রত। আজও প্রতিমুহূর্তে আমরা তাঁর উপস্থিতি অনুভব করি।’