অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: গুজরাটের সুরাট শাড়ির দৌলতে পূর্বস্থলীর হস্তচালিত তাঁতশিল্পের বাজার ধ্বংস হয়েছে আগেই। তাঁতের কাপড় বোনা ছেড়ে তাঁতশিল্পীরা নতুন কাজের সন্ধানে পাড়ি দিয়েছেন ভিনরাজ্যে। কেউবা দিনমজুরি করে সংসার চালাচ্ছেন। তবে, অসমের ঐতিহ্যবাহী ‘মেখলা’ শাড়ির হাত ধরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পূর্বস্থলীর হস্তচালিত তাঁতশিল্প। গোটা পূর্বস্থলীজুড়েই মেখলা শাড়ি বোনা হচ্ছে। কাজ পাচ্ছেন তাঁতশিল্পীরা। তাঁদের মুখে হাসি ফুটছে।
অসমে মেখলা শাড়ি ঐতিহ্যবাহী। অসমীয়ারা এটি বিশেষভাবে পরতে পছন্দ করেন। সারা অসমজুড়ে মেখলা শাড়ি বোনা হয়। এর কদরও বাড়ছে। পাটের সূতো ছাড়াও রেশন সূতো দিয়ে এমন শাড়ি তৈরি করা যায়। এর নকশা হাতে বুনে ফুটিয়ে তুলতে হয়। সেই মেখলা শাড়ি এবার পূর্বস্থলীজুড়েই বোনা শুরু হয়েছে। তাতে অন্তত তাঁতশিল্পীরা নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন। পুরনো হস্তচালিত তাঁত যন্ত্র আবার চালু হয়েছে। পূর্বস্থলী-২ ব্লকের লক্ষ্মীপুর ডাঙাপাড়া, পূর্বস্থলী-১ ব্লকের শ্রীরামপুর, সমুদ্রগড়, ধাত্রীগ্রামেও শুরু হয়েছে মেখলা শাড়ি বোনার কাজ। এক একটি মেখলা শাড়ি দু’ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। কখনো তা সাড়ে ৮ হাজার টাকায় পর্যন্ত বিক্রি করা হয়।
কাটোয়া-কালনা মহকুমার হ্যান্ডলুম অফিসার রঞ্জিত মাইতি বলেন, অসমের মেখলা শাড়ি এখন পূর্বস্থলীজুড়ে বোনা হচ্ছে। তাঁতশিল্পীরা নিজেরা আবার আমাদের দপ্তর থেকেও অসমের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ধীরে ধীরে ধুঁকতে থাকা হস্তচালিত তাঁতশিল্পের প্রসার বাড়ছে।
অসম থেকে বরাত নিয়ে এসে পূর্বস্থলীজুড়ে বোনা হচ্ছে। তারপর আবার তা অসমে পাঠানো হচ্ছে। সেখানেই আবার মেখলা শাড়ি বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। কয়েক মাস আগে পূর্বস্থলীর লক্ষ্মীপুরে অসম থেকে ৩০ জন তাঁতশিল্পী এসে মেখলা কীভাবে বোনা হচ্ছে, তা তাঁরা ঘুরে দেখে গিয়েছেন। পূর্বস্থলীর লক্ষ্মীপুর ডাঙাপাড়ার বাসিন্দা আল আমীন শেখ, তাপস বৈরাগ্য বলেন, আমরা অসম থেকে বরাত পাই মেখলা শাড়ি বোনার। তারপর আমরা তা বাড়িতে হস্তচালিত তাঁতযন্ত্রে বুনে আবার তা অসমে পাঠিয়ে দিই। তাতে অন্তত আবার হস্তচালিত তাঁতশিল্পের কদর বাড়ছে। শ্রীরামপুরের তাঁতশিল্পী তপা বসাক, ভজন দাস বলেন, মেখলা শাড়ির যা কারুকার্য রয়েছে, সবই আমরা তা হাতে বুনে দিই। এতে একটা শাড়ি বুনে ভালই মজুরি পাচ্ছি। অন্তত সংসারটা চলে যাচ্ছে।
তাঁতশিল্পী তপন বসাক বলেন, আমাদের হস্তচালিত তাঁত শিল্পটাকে প্রথম ধ্বংস করেছে পাওয়ারলুম শাড়ি। তারপর পুরো বাংলার তাঁত শিল্প ধ্বংস করেছে গুজরাটের সুরাত শাড়ি। আর বাংলাদেশের পাওয়ারলুমে বোনা শাড়ি অল্প দামে রাজ্যের বাজারে ছেয়ে যাচ্ছে। তাতে আমরা আর পাল্লা দিতে পারছি না। আমরা একটা বাংলার তাঁতের শাড়ি বুনে মজুরি লাগে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু এর থেকেও কম টাকায় বাংলাদেশের পাওয়ারলুমের শাড়ি পেয়ে যাচ্ছে রাজ্যের মানুষ। তাতে আমাদের হস্তচালিত তাঁতযন্ত্র তুলে দিতে হয়েছিল। এখন আবার আমরা অসমের মেখলা শাড়ি বুনে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। ধীরে ধীরে বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতশিল্পের বাজার চাঙা হচ্ছে।
পূর্বস্থলী এলাকাকে পূর্ব বর্ধমান জেলার তাঁত বলয় বলা হয়। পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমাতেই সবচেয়ে বেশি তাঁত শিল্পী রয়েছেন। বাবুইডাঙা, লক্ষ্মীপুর, তামাঘাটায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে কয়েক হাজার হস্তচালিত তাঁতযন্ত্র। দেশ ভাগের পর ওপারবাংলা থেকে তাঁতশিল্পীরা এদেশে পূর্বস্থলী সহ নানা জায়গায় ঘর বেঁধেছেন। তাঁদের হাত ধরেই নতুন করে রাজ্যে তাঁতশিল্পে জোয়ার এসেছিল। আবার অসমের মেখলার হাত ধরে হস্তচালিত তাঁতের সুদিন ফিরছে।