


বিশেষ নিবন্ধ, শুভজিৎ অধিকারী: ক’মাস আগে সতীশ আচার্যের একটি কার্টুন বেশ সাড়া ফেলে গোটা দেশেই। একটি গাছে দড়িতে বাঁধা এক ব্যক্তি। উন্মত্ত কয়েকজন লোক তাঁকে বেধড়ক পেটাচ্ছে। তাঁদের মুখ নির্দেশ করে সতীশের ‘কোড’, ‘বোলো জয় শ্রীরাম’! ছবির এক কোণে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের ছবি। তাঁর মুখ দিয়ে সতীশ বলাচ্ছেন—‘প্লিজ, নট ইন মাই নেম!’ কার্টুনটির গভীর তাৎপর্য বোঝার দিন আজ, রামনবমী।
আমরা যাঁরা গ্রামাঞ্চলে বড়ো হয়েছি, খুব কম জনেরই ছিল পাকা বাড়ি। বাকি সবার মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল। একটু অবস্থাপন্নদের টিন অথবা টালি। বর্ষাকালে বাজ পড়লে মনে হতো, এই বুঝি চাল ফুটো করে ঘরে ঢুকলো বিদ্যুতের ঝলকানি। তখন মায়েরা তাঁদের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে অথবা কোলে তুলে চোখ বুজে পরম ভক্তির সঙ্গে বলতেন—‘শ্রীরামচন্দ্র...শ্রীরামচন্দ্র...শ্রীরামচন্দ্র।’
বড়ো হয়ে মাঠে যেতে হতো দিনমজুরদের সঙ্গে, সকালের খাবার নিয়ে। দলে পড়শি পাড়ার মুসলিম কাকা-জ্যাঠারাও থাকতেন। তখন হয়তো বৃষ্টি নামল। সঙ্গে বিদ্যুতের চমকানি। সবাই কাজ বন্ধ করে সমস্বরে বলতেন—‘শ্রীরামচন্দ্র...শ্রীরামচন্দ্র...শ্রীরামচন্দ্র।’ একদিন মায়ের কাছে জানতে চাইলাম, বাজ পড়লে তোমরা তিনবার রামচন্দ্রের নাম বলো কেন? মা বললেন, ভগবান শ্রীরামচন্দ্র হলেন আমাদের রক্ষাকর্তা। বিপদমুক্তির পুরুষোত্তম পুরুষ। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তায় একাকী অশরীরী আত্মার ভয় পেলেও আমরা রাম...রাম...রাম... বলি। অর্থাৎ, সব অশুভ শক্তির বিনাশকর্তাও শ্রীরামচন্দ্র।
কিন্তু, রামনামে কি এমন মাহাত্ম্য যে বাজ স্পর্শ করে না, ভূত-প্রেতও দূরে সরে যায় বলে আমাদের বিশ্বাস? আজ, শ্রীরামচন্দ্রের জন্মদিন। দশরথ ও কৌশল্যার ঘরে এসেছিলেন সূর্যবংশীয়জাত ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সপ্তম অবতার। দেশের চতুর্দিকে পালিত হচ্ছে রামনবমী। সন্দেহ নেই, ভগবান রামকে স্মরণে এ এক সাধু উন্মাদনা। কিন্তু, সেই উন্মাদনা যখন ‘উন্মত্ততার’ রূপ নেয়, তখন রামনামের মাহাত্ম্য নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেন শোভাযাত্রার ভক্তরা!
তুলসীদাসের রামচরিতমানসের প্রথম অধ্যায় বালকাণ্ড। সেখানে তুলসীদাস রামনামের বেশ কিছু অলৌকিক শক্তির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। শুরু করেছেন এই বলে, ‘আমি রঘুদের প্রধান রামনামকে অভিবাদন জানাই। যা সূর্যদেব, অগ্নিদেব এবং চন্দ্রদেবের প্রতিনিধিত্বকারী বীজ অক্ষর নিয়ে গঠিত। সেই বীজ অক্ষর যথাক্রমে রা, অ আর ম।’ পাদটীকায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, সংস্কৃত বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষর ও ধ্বনি এক একটি বীজমন্ত্র। যা ঈশ্বরের একটি গুণকে আহ্বান করে। রামনামকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এতে দু’টি অক্ষর রয়েছে। কিন্তু, বীজমন্ত্র তিনটি—‘র’, ‘অ’, এবং ‘ম’। এবারে আসা যাক, ‘র’ বলতে আমরা বুঝি সূর্য, ‘অ’ বলতে অগ্নি এবং ‘ম’ বলতে চন্দ্র। এই চরাচরে আলোর তিনটি উৎস সূর্য, অগ্নি এবং চন্দ্র। তাই, রামনাম জপ করা হল ঈশ্বরের পরম আলোকে আহ্বান করার একটি পদ্ধতি। বাইবেলে বলা হয়েছে ‘ঈশ্বরই আলো।’ রামনামের এই জ্যোতির্ময় দিকটি নিয়েও তুলসীদাস নির্দেশ করেছেন, শ্রীরাম হলেন সত্য, চেতনা এবং আনন্দ (সৎ-চিৎ-আনন্দ)-এর সম্মিলিত রূপ। অজ্ঞানতার অন্ধকার তাঁর মধ্যে সামান্যতম পরিমাণেও টিকে থাকতে পারে না।
অতঃপর, রাম মানেই আলোক শক্তি। তাঁকে আহ্বান করার অন্তর্নিহিত অর্থও বড়ো রহস্যময়। যা গভীরভাবে অনুধাবন করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, রামকে আবাহন প্রথাটি সর্বজনীন। বাজ বা সৌদামিনী আলোক শক্তির একটি অংশ। সেই শক্তিকে প্রতিরোধ করতে পারে একমাত্র তারই কোনো অনুরূপ শক্তি। ফলে, বাজের হাত থেকে বাঁচতে হলে একমাত্র ভরসা হতে পারে রামনামই। এমনই বিশ্বাস থেকে মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে রামচন্দ্র হয়ে ওঠেন সার্বিক রক্ষাকর্তা। তুলসীদাস রামনামের এহেন রহস্যময় শক্তিকে প্রমাণ করতে ভারতের বহু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলির সাহায্য নিয়েছেন। এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘শাস্ত্র বলে পবিত্র কাশীনগরীর অধিষ্ঠাতা দেবতা ভগবান শিব। সেই কাশীনগরে মৃত্যুপথযাত্রী প্রতিটি প্রাণীর ডান কানে রামনামটি ফিসফিস করে ঢুকিয়ে দেন তিনি। আসলে এর মাধ্যমে মৃত্যুপথযাত্রী আত্মাকে মুক্তি দেন দেবাদিদেব।’ এখানে আশ্চর্যের বিষয়, নিজে শ্রেষ্ঠ দেবতার আসন দখল করেও কীভাবে অন্যের কর্ণকুহরে রামনাম প্রবেশ করিয়ে তাঁকে মুক্তিদান করেন শিব? তুলসীদাস একাধিক শাস্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে তারও জবাব দিয়েছেন। বলেছেন, পরম বৈষ্ণবাচার্য শিব হলেন রামচন্দ্রের পরম ভক্ত। তিনি ব্রহ্মাণ্ডের সকল প্রাণীর মঙ্গলের জন্য নিরন্তর রামনাম জপ করেন।
রামনামের এহেন মাহাত্ম্যে বিশ্বাস রেখেই শ্রীরামচন্দ্রের জন্মদিন পালিত হয়ে আসছে ভারতবর্ষে। কিন্তু এই রামনবমী পালন আমাদের কী শিক্ষা দেয়? কলি সন্তরণ উপনিষদে বলা হয়েছে, ঘোর কলিকালে অন্যায়, অবিচার ও অশুভ শক্তির বিনাশে পথ দেখাতে পারে একমাত্র শ্রীরামচন্দ্রের নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ। তাই, শ্রীরামচন্দ্রকে ‘মৰ্যাদা পুরুষোত্তম’ বলেও হিন্দু পুরাণগুলিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রামনবমী ব্রত পালনের মাধ্যমে তাঁর জীবনদর্শনকে অনুসরণের সমাজ সংস্কারের বিদ্রোহী পুরুষ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। সেইসঙ্গে অবশ্যই আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রার্থনার অন্যতম অঙ্গও রামনবমী উদযাপন। কীভাবে তা পালন করতে হবে, তার একটা রূপরেখা দিয়ে গিয়েছেন ভারতবর্ষের প্রাচীন মুনি-ঋষিরা। রামনবমীর দিন ভক্তদের অবশ্য কর্তব্য রামায়ণ পাঠ। রামচন্দ্রের ভজন-কীর্তন প্রভৃতি। এ দিন সূর্যদেবকে পুজো করারও কথা বলা হয়েছে বহু পুরাণে।
অতঃপর, ভারতের উৎসব-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক রামনবমী। মধ্যযুগীয় ভারতে ভক্তিবাদ আন্দোলনের অন্যতম উৎসব ছিল এটি। সেই থেকে দেশের নানাস্থানে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে পালিত হয় দিনটি। রামজন্মভূমি বলে কথিত উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় রামকথা পাঠের মাধ্যমে দিনটি শুরু হয়। ভগবান রামের গল্প, লোককথা এবং পৌরাণিক কাহিনি বর্ণনা করা হয়। ভক্তরা দিনভর কীর্তন ও ভজনে অংশ নেন। দেশের উত্তরাঞ্চলে ভগবান রামের নবজাতক রূপের ছোট্ট মূর্তি তৈরি করে পুজো করার প্রথা প্রচলিত। শিশু রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দিনভর উপবাস বা ব্রত পালন করারও চল রয়েছে।
দক্ষিণভারত অবশ্য স্ব-ঐতিহ্য মেনে রামনবমী উদযাপন করে। রামের সঙ্গে সীতা, লক্ষ্মণ ও ভক্ত হনুমানকে সম্মান জানাতে কর্ণাটকের বিভিন্ন অংশে রথযাত্রার আয়োজন করা হয়। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পথচলতি মানুষকে পানাকাম (গুড় দিয়ে তৈরি এক প্রকার পানীয়) পরিবেশন করা হয়। কোথাও কোথাও রামগাথা কর্ণাটকী সংগীতও পরিবেশিত হয়। তামিলনাড়ুতে ভোরের সূর্যকে জল নিবেদন করে দিনটি পালন করা হয়।
সত্যি বলতে কী, আমাদের এই বাংলায় উত্তর কিংবা দক্ষিণ ভারতের মতো রামনবমী পালনে আজকের মতো উত্তুঙ্গ উন্মাদনা কোনোকালেই ছিল না। ভগবান রামকে শ্রদ্ধা জানাতে বৈষ্ণবতীর্থগুলিতে হরিনাম সংকীর্তনের আসর বসত। রামনবমী ব্রত পালন করা হতো কোনো কোনো পরিবারে। রাতভর রামায়ণ গানও পরিবেশিত হতো। ভক্তিই ছিল এইসব অনুষ্ঠানের মূল শর্ত। সেখানে আপামর মানুষ যোগদান করতেন। ইদানীং রামনবমী পালনে বিরাট হিড়িক বাংলার সর্বত্র। সন্দেহ নেই, রামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে বঙ্গবাসীর এটা ‘সাধু চেতনা’। কিন্তু যখন অভিযোগ ওঠে, সশস্ত্র শোভাযাত্রার মধ্যে ‘জয় শ্রীরাম’ হুংকার দিয়ে শাসানির, অশান্তি ছড়ানোর, এমনকী রক্তপাতের! তখন বিচলিত বোধ করেন সকলেই। শুধু তাই নয়, রামনবমীর মহৎ উদ্দেশ্যকেও ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে একমাত্রিকতার মোড়কে। অর্থাৎ, রামচন্দ্র যেন শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী অস্ত্রধারীদেরই একমাত্র আরাধ্য, আর কারও নয়!
অথচ, রামনাম সর্বশ্রেণির মানুষের সর্বশক্তির আধার। এই ভারতেই ধর্মপ্রাণ মুসলিমদেরও একটা অংশ রামনামে শক্তি সঞ্চয়ের পথ খোঁজেন। ভারতের অঙ্গরাজ্য কেরল। সেখানকার মালাবার অঞ্চলে মূলত মুসলিমদের বসবাস। যাঁদের মোপলা বা মাপ্পিলা জনগোষ্ঠী বলে। মূল রামায়ণের সুরকে এক রেখে তাঁরা তৈরি করে নিয়েছেন ‘মাপ্পিলা রামায়ণ’। এই রামকাহিনির প্রায় পুরোটাই ঠোঁটস্থ করে ফেলেছিল কেরলের এক ব্রাহ্মণ কিশোর। সেই টিএইচ কুনহিরামন নাম্বিয়ার পরে লোকসংস্কৃতির গবেষক হন। তিনি ‘মাপ্পিলা রামায়ণ’ সংরক্ষণ করে ভারতের বহুত্ববাদী মর্যাদাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সাহিত্যিক এমএন কারাসেরি পুরোটা লিপিবদ্ধ করে ‘কুরিমানম্’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেন ‘মাপ্পিলা রামায়ণ’কে। ইন্দোনেশিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম। সেখানে শ্রীরাম তাঁদের ও হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমাদের রামায়ণ যতদিন সংস্কৃত ভাষায় উপলব্ধ ছিল, ততদিন তা ছিল অভিজাতদের কুক্ষিগত। শুনতে অবাক লাগলেও এটা ইতিহাস সত্য, সেই রামায়ণকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে মুসলিমদের অবদান অনস্বীকার্য। মোগল সম্রাটদের সৌজন্যে সংস্কৃত ভাষায় রচিত রামায়ণটি ফারসি এবং অবধী ভাষায় অনূদিত হওয়ার পর সকলের কাছে সহজলভ্য হয়। সম্রাট আকবরই সর্বপ্রথম রামায়ণের অনুবাদ ও অলঙ্করণ করান। তুলসীদাস প্রথমে এটি ওড়ি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। আকবরের নির্দেশে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মাওলানা আব্দুল কাদির বাদায়ুনি এটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন। সংস্করণটির নাম ছিল ‘রামায়ণ-ই-মসিহি’। আকবরের মা হামিদা বানু বেগমের কাছে গচ্ছিত ছিল গ্রন্থটি। আকবরের সভাসদ আবুল ফজল লিখেছেন, ‘সংস্করণের কাজটি সম্রাটের আদেশেই করা হয়েছিল।’ আল্লামা ইকবালের মতো একজন ইসলামপন্থী কবিও ‘রাম’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। কবিতায় তিনি শ্রীরামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এরকম অজস্র উদাহরণ ভারতের ইতিহাসে মণি-মুক্তোর মতো ছড়িয়ে রয়েছে।
আজ, যাঁরা কথায় কথায় ইতিহাস উপড়ে ফেলার হুংকার দিচ্ছেন, তাঁরা আসলে ভারতবর্ষের এই বহুত্ববাদের মূলেই কুঠারাঘাত করতে চাইছেন। ‘রামনাম’ আর ‘জয় শ্রীরাম’-এর সংঘাতটা ঠিক এখানেই!