


সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার কারণে এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই মওকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে কালোবাজারিরা। শহর, মফস্সল মিলিয়ে প্রায় সর্বত্র গৃহস্থদের মধ্যে বিশেষ উদ্বেগ লক্ষণীয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে বুকিং করে গ্যাস না-পাওয়াতেই উদ্বেগ বেড়েছে। দিনকয়েক আগে বুকিংই করা যাচ্ছিল না। এখন বুকিং হলেও ডেলিভারি পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়ে গিয়েছে। এজন্য কিছু জায়গায় গ্যাসের দোকানে লম্বা লাইন, ধরনা চলছে। অটোরিকশ চালকদের লাইন দীর্ঘতর হচ্ছে বিভিন্ন পাম্পে। এসব নিয়ে অশান্তির খবরও সামনে আসছে প্রায় রোজ। বেশিরভাগ পরিবার গ্যাসের ব্যবহারে নিজেরাই রেশনিং চালু করেছে। দুবেলার বদলে একবেলা রাঁধছে। কমেছে রান্নার পদ। বেড়েছে ইনডাকশন আভেনের ব্যবহার। বহু হোটেল রেস্তরাঁ ক্যান্টিনে ঝাঁপ ফেলে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আতান্তরে পড়েছেন ক্যাটারিং ব্যবসায়ীরা। কারণ কমার্শিয়াল এলপিজি সিলিন্ডারের জোগানে আকাল আরো বেশি। অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির পরও জোগানে উন্নতি হয়নি। অন্যদিকে সিলিন্ডার ছিনতাই হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভীত ডেলিভারিম্যানরা। সব মিলিয়ে বিভ্রান্তির এক চূড়ান্ত অবস্থা দেশজুড়েই। গ্যাসের জন্য গিন্নি থেকে বাড়ির কর্তা, ফুড ব্যবসায়ী প্রভৃতির যখন মাথার চুল ছেঁড়ার অবস্থা তখন সরকার দাবি করছে ‘সব ঠিক হ্যায়!’
অথচ কেন্দ্রেরই তরফে নোটিস জারি করা হচ্ছে সিলিন্ডার বুকিংয়ে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির জন্য। প্রথম ফতোয়া ছিল, শহরের গ্রাহকরা ২৫ দিন এবং গ্রামের গ্রাহকরা ৪৫ দিনের আগে বুকিং করতে পারবেন না। পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস (পিএনজি) নেটওয়ার্ক বৃদ্ধিতেও নতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়। বলা হয়, যে-অঞ্চলে পিএনজি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা তা না নিলে পরবর্তী তিনমাসের মধ্যে বাড়ির এলপিজি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির তরফে জানানো হয় যে, পরবর্তী বুকিংয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৩৫ দিন! উজ্জ্বলা যোজনার গ্রাহকরা ডেলিভারির ৪৫ দিন পর, ডবল সিলিন্ডারের গ্রাহকরা ৩৫ দিন পর এবং সিঙ্গল সিলিন্ডারের গ্রাহকরা ২৫ দিন পর ফের বুকিং করতে পারবেন। এই নির্দেশিকা জারি যে পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের সিদ্ধান্তেই তাতে সংশয় কী! স্বভাবতই তোলপাড় শুরু হয় গ্রাহক মহলে। অমনি পালটি খায় মোদি সরকার। পাঁচ জায়গায় বিধানসভার ভোট সামনে। ভোটের বড়ো বালাই কই? সরকারের এখন ছুঁচো গেলার অবস্থা। কোনো সন্দেহ নেই যে, সেই চাপেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভোলবদল করেছে মোদি সরকার। নিয়মে ফের বদল আনা হল বুধবার। সেটাও ৩৫ দিনের ফতোয়াকে সরাসরি অস্বীকার করে। সাফ জানানো হল, সিলিন্ডার ডেলিভারি ও পরবর্তী বুকিংয়ের মধ্যে ২৫ দিনের ব্যবধানই বলবৎ থাকছে। কেন্দ্র অবশ্য এই ডিগবাজির দায় চাপিয়েছে মিডিয়ার উপর। বিবৃতি দিয়ে পেট্রলিয়াম মন্ত্রক বলেছে, বুকিংয়ের জন্য ৩৫ দিন অপেক্ষা করার খবরটি অসত্য। নিয়মে কোনো বদল আনা হয়নি। ২৫ দিনের ব্যবধান এখনো বহাল। সরকারের এটা পরিষ্কার মিথ্যাচার, দ্বিচারিতা। নয়া নিয়ম দেখিয়ে মঙ্গলবার সফটওয়্যারে বদল এনেছিল তেল সংস্থাগুলিই। বুধবার তা ফের বদলে ফেলা হল। এমনকি, যে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে নয়া নিয়ম প্রচারিত হয় সেটিও ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে।
তারপরই কেন্দ্রের আরজি, গুজবে কান দেবেন না। কেউ প্যানিক বুকিং করবেন না। সিলিন্ডারের পর্যাপ্ত স্টক আছে বলেও ভরসা দিয়েছে সরকার। দিল্লি আরো জানিয়েছে, বর্তমান নির্দেশ অনুযায়ী, শহরের গ্রাহকরা ২৫ দিন পর এবং গ্রামের গ্রাহকরা ৪৫ দিন পর বুকিং করতে পারবেন। এক্ষেত্রে উজ্জ্বলা, ডবল ও সিঙ্গল সিলিন্ডার সংযোগের মধ্যে কোনো তফাত করা হবে না। একই কথা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে পেট্রলিয়াম মন্ত্রকও। অন্যদিকে, পেট্রলিয়াম মন্ত্রককে উদ্ধৃত করে মিডিয়া রিপোর্ট করেছে, দেশে এলপিজি সিলিন্ডারের কোনো অভাব নেই, বুকিংয়ের দু-তিনদিনের মধ্যেই সিলিন্ডার পাওয়া যাবে। সর্বদল বৈঠকে মোদি সরকারের দাবি, দেশে জ্বালানি পরিস্থিতি স্থিতিশীল, আরো তেল এবং গ্যাসবাহী জাহাজ আসছে। ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ভারতের। উদ্বেগের কিছু নেই এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। রীতি অনুযায়ী, বৈঠকে সব দলই সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়ে সংকটকালে সর্বতোভাবে সরকারের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে। তার মানে, সকলের সমর্থন পাওয়ার পরেও সরকারের লেজেগোবরে দশা! কিন্তু এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি কেন? সরকার কি দুর্বল হয়ে পড়েছে কোনো কারণে? সরকারের এই দোলাচলের দরুনই কিন্তু মানুষের উদ্বেগ, ভোগান্তি অব্যাহত।