


রঞ্জুগোপাল মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়া: তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির যুগে অ্যানড্রয়েড সেটে এক ক্লিকেই দীর্ঘ হিসেব সেরে নেওয়া যায়। ব্যবসার হিসেব রাখার জন্য হাজারো মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপ বের হয়ে গিয়েছে। অ্যানড্রয়েড সেটে তা ডাউনলোড করে রাখলেই ব্যবসায়ীদের ঝক্কি অনেকটাই কমে যায়। হিসেবে ভুলভ্রান্তি হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে। কারণ বর্তমানে নগদের পাশাপাশি ইউপিআইয়ে যে কোনও সামগ্রীর দাম মেটানোর প্রবণতাও অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখনও বাংলা নববর্ষে হালখাতার কোনও তুলনা নেই। লাল মলাটে মোড়া হালখাতায় ইষ্ট দেবদেবীর নাম লিখেই বছরের হিসেব শুরু করেন বহু ব্যবসায়ী। তার আগে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হালখাতার জন্য বিশেষ পুজোপাঠের আয়োজন করা হয়। উন্নত মুঠো ফোনের দাপটও বাঙালির হালখাতাকে ব্যাকফুটে ফেলতে পারেনি। বাংলা পাঁজি ক্যালেন্ডারের মতোই হালখাতার বাজার আজও অটুট রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন। বাংলা নববর্ষের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই বাঁকুড়া শহর সহ জেলার দোকানগুলিতে হালখাতা কেনার ভিড় লক্ষ্য করা গিয়েছে।
উল্লেখ্য, একসময় বাঙালির ঘরে ঘরে পঞ্জিকা এবং পাঁজি ক্যালেন্ডারের দেখা মিলত। সেসবে দোল থেকে দুর্গোৎসব সবেরই খুঁটিনাটি তথ্য লিপিবদ্ধ থাকত। দাদু-ঠাকুমারা পাঁজি দেখে পূর্ণিমা, অমাবস্যা বা গ্রহণের ব্যাপারে জেনে নিতেন। সেই মতো বাড়ির অন্যান্যদের পরামর্শ বা উপদেশ দিতেন। পুরোহিতদের ব্যাগে ব্যাগে ঘুরত বিশেষ এক ফুল পঞ্জিকা। তা দেখে অন্নপ্রাশন থেকে বিবাহ সব শুভ অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ স্থির হতো। কর্মব্যস্ত বাঙালি এখন অবশ্য সেসব দেখার ফুরসৎ পায় না। তবে সময়ে-অসময়ে অন্যদের কাছ থেকে জেনে নিতে অনেককেই দেখা যায়। তবে এখনও যে পাঁজি ক্যালেন্ডার ও পঞ্জিকার চাহিদা তেমন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়নি তা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে। একইরকমভাবে ‘অ্যাপ নির্ভর’ বাঙালির কাছে আজও হালখাতার গুরুত্ব আগের মতোই রয়েছে।
বাঁকুড়া শহরের স্বর্ণকার সুবল দাস বলেন, সারাবছর নগদের পাশাপাশি অনেকে ধারেও গয়না কিনে নিয়ে যান। তাঁরা বছর অন্তে টাকা পরিশোধ করেন। বাংলা বছর ধরেই আমরা হিসেব-নিকেশ করে থাকি। ফলে পয়লা বৈশাখ নতুন খাতায় জমা-খরচের হিসেব শুরু হয়। এখনও আমরা লাল মলাটের হালখাতা ব্যবহার করি। তাতেই সারা বছরের হিসেব থাকে। তবে ছেলের মোবাইলে একটি অ্যাপ আছে। তাতে সে সোনা-রুপোর দর দেখার পাশাপাশি পাইকারি বেচাকেনার হিসেব রাখে। আমরা অবশ্য এখনও তাতে অভ্যস্ত হতে পারিনি। আমাদের কাছে হালখাতাই ভরসা। হালখাতা বিক্রেতা ধনঞ্জয় কর্মকার বলেন, নববর্ষে ব্যবসায়ীদের একাংশ নতুনখাতা করেন। তবে নববর্ষের পাশাপাশি অনেকে অক্ষয় তৃতীয়াতেও হালখাতা করেন। ফলে ওই সময়েও হালখাতা বিক্রি হয়। আগের মতোই হালখাতা ব্যবহারের রেওয়াজ ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির যুগেও তা বিক্রিতে ভাটা পড়েনি।