পাপ করলে নাকি নরকে যেতে হয়! তবেই মুক্তি! নরকে গেলে মানুষ পাপের শাস্তি পায়— ছেলেবেলা থেকে এমন গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছি আমরা। এতে আর যাই হোক নরক দেখার ইচ্ছে কারও হয় না। আর ‘নরকের দরজা’ নামটা শুনলেই অনেকেরই বুকের ভেতরটা ভয়ে ছ্যাঁত করে ওঠে, শরীরে কাঁটা দেয়! মনে হতে পারে এই দরজা দিয়েই হয়তো নরকের ভেতর প্রবেশ করতে হয়। কতটা ভয়ংকর অনুভূতি হতে পারে তা চিন্তাও করা যায় না। পৃথিবীর পাপী মানুষেরাই মৃত্যুর পর নরকে যায়। ভোগ করতে হয় অসহ্য যন্ত্রণা। অথচ এই পৃথিবীতেই আছে একটা ‘নরকের দরজা’। কিন্তু এই নরকে নেই কোনও নরকযন্ত্রণা। আছে সীমাহীন বিস্ময় আর মন্ত্রমুগ্ধ হওয়ার অদ্ভুত চিত্র।
পৃথিবীতে বেঁচে থাকা অবস্থায় কেউ নরকের দরজা দেখার যন্ত্রণাবিহীন সুন্দর অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে তাকে যেতে হবে মধ্য এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের দেশ তুর্কমেনিস্তানে। এই তুর্কমেনিস্তান একসময় ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি অঙ্গ। ১৯২৪ সালে এটি তুর্কমেন সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (এসএসআর) নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে তুর্কমেনিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। উত্তরে উজবেকিস্তান ও দক্ষিণে ইরানের মাঝামাঝি অবস্থান করে তুর্কমেনিস্তান। বর্তমানে স্বাধীন তুর্কমেনিস্তানের রাজধানীর নাম আশখাবাদ। এই তুর্কমেনিস্তান খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ দেশ। তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমির মাঝামাঝি অবস্থিত ৩৫০ জন বাসিন্দা নিয়ে গড়ে উঠেছে দারভাজা নামে একটি ছোট্ট গ্রাম। মরুভূমির বালুকাময় উপরিভাগের তলায় ছড়িয়ে থাকা কালো মাটির কারণে তুর্কি অভিধান অনুযায়ী মরুভূমির এই নামকরণ করা হয়।
১৯৭১ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূতত্ত্ববিদরা প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ দারভাজা এলাকায় অনুসন্ধানের সময় একটি স্থান আবিষ্কার করেন। প্রথমে তাঁরা মনে করেছিলেন এটি একটি খনিজ তৈল ক্ষেত্র। তাই ড্রিলিং মেশিন দিয়ে তেল উত্তোলনের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেন এবং সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করে। এই খোঁড়াখুঁড়ির সময় দুর্ঘটনাক্রমে মাটি ধসে পুরো ড্রিলিং রিগসহ পড়ে যায়। যদিও এই দুর্ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। তেল অনুসন্ধানে সাফল্য সেখানে আসেনি। কিন্তু এই খোঁড়াখুঁড়ির ফলে সেখানে তৈরি হয় বিশাল এক গোলাকার ক্রেটার বা গর্ত। এটি ‘দারভাজা গ্যাস সেন্টার’ নামে দারুণ জনপ্রিয়। এই গর্তের ব্যাস ২২৬ ফুট (৬৯ মিটার) এবং গভীরতা ৯৮ ফুট (৩০ মিটার)। তবে কার্যক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল, ড্রিল করলেই বেরিয়ে আসছে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত গ্যাস। এই গ্যাস বাতাসের সংস্পর্শে এলে আগুন জ্বলে ওঠে। ধু-ধু মরুভূমির মাঝে ৩০ মিটার গভীর এই রহস্যময় এই গর্ত যা প্রায় ৫৪ বছর ধরে দিনরাত অবিরাম দাউ দাউ করে জ্বলছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, ভয়াবহ দানবীয় এই জ্বলন্ত গর্তমুখ দিয়েই যেতে হয় নরকে। তাই মুখে মুখে নাম পেয়েছে ‘নরকের দরজা’ বলে। অনেকে আবার একে ডেভিল বা ‘শয়তানের সুইমিংপুল’ বলেও ডাকে। বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর স্থানগুলোর অন্যতম হল এই নরকের দরজা। জন ব্র্যাডলি নামে মার্কিন আলোকচিত্রীর কারণেই এই জায়গার নাম ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।
কেন অবিরত জ্বলছে এই ক্রেটার? ভূতত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানীরা এখনও এর স্বতঃসিদ্ধ ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তবে অনেকের মতে, সালফার, মিথেন সহ বেশ কিছু গ্যাসের কারণেই জ্বলে এই আগুন। গর্তের মুখ থেকে সবসময়েই সালফারের গন্ধ বের হয়। খোঁড়াখুঁড়ির সময় গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা কোটি কোটি ঘনফুটের গ্যাসের বিষক্রিয়ায় প্রথমে মারা যেতে শুরু করেছিল পশুপাখি। মৃত্যুভয়ে পালাতে শুরু করেছিল দারভাজা গ্রামের মানুষ। চিন্তায় পড়েছিল খনিজ তেল অনুসন্ধানকারীর দল। গ্যাস নির্গমনের পথ কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছিল না। পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশকে বাঁচাতে এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভূতত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানীরা। তারা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন বিশাল গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসা মিথেন গ্যাসে। বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন গর্তে গ্যাস কিছুদিনের মধ্যেই পুড়ে শেষ হয়ে যাবে। নিভে যাবে আগুন, বেঁচে যাবে পরিবেশ। কিন্তু মেলেনি বিজ্ঞানীদের হিসাব। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে দিনরাত জ্বলছে এই কূপ। একবারের জন্য আজও নেভেনি।
গ্যাসক্ষেত্রটি এবং এর আশপাশের স্থান বন্য মরুভূমি ক্যাম্পিং-এর জন্য বিখ্যাত। বর্তমানে ‘নরকের দরজা’ স্থানটি পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। এই জ্বলন্ত গর্ত রাতের আঁধারে এক অপূর্ব দৃশ্য। মনে হবে পৃথিবীতে নেমে এসে জ্বলজ্বল করছে তারা। সন্ধে হতেই অনেক দূর থেকেও এই আগুনের লেলিহান শিখা চোখে পড়ে। উপগ্রহতেও ধরা পড়েছে সেই ছবি। অনেকে এই অগ্নিগর্ভটিকে ‘কারাকুম মরুভূমির চমক’ বলেও ডাকেন। ২০১০ সালে তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট এটি বন্ধ করার নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিক গ্যস উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি করতেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নরকের দরজা দেখতে পর্যটকদের প্রবল উৎসাহে সিদ্ধান্ত বদল করতে বাধ্য হয় সরকার। এই এলাকার আয়ের অন্যতম উৎসই এই নরকের দরজা।
তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশাখাদের আন্তর্জাতিক বাসস্ট্যান্ড থেকে তিন ঘণ্টায় ট্যুরিস্ট-ট্যাক্সি বা বাসে করে পৌঁছনো যায় দারভাজা বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘নরকের দরজা’ খ্যাত কূপটি। সেখানে পর্যটকদের রাতে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক কটেজ। গড়ে তোলা হয়েছে বিলাসবহুল ক্যাম্পও। কেউ চাইলে গাড়ি নিয়ে ঘুরে দেখতে পারেন গোটা এলাকা।
নরকের দরজার প্রকৃত রূপ দেখতে হলে যেতে হবে রাতের অন্ধকারে। রাতে অনেক দূর থেকে দেখা যায় রক্তিম আভা। রাতে কাছে গিয়ে দাঁড়ালে মনে হবে চলে এসেছি পৃথিবীর বাইরে কোথাও, তবে খুব কাছে যাওয়া যায় না। যতটুকু যাওয়া যায়, সেখানেও ১০ থেকে ১২ মিনিটের বেশি দাঁড়িয়ে থাকা যায় না উত্তাপের কারণে। শুরুতে খুব বেশি পর্যটকের চাপ না থাকলেও এখন অনেকেই কৌতূহলবশত এই ‘নরকের দরজা’ দেখতে ভিড় জমান। যদিও এটি একটি ভয়ঙ্কর স্থান, তবে এর রহস্য, এর সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। একদিকে যেমন এটি ভীতিকর, অন্যদিকে এর অদ্ভুত সৌন্দর্যও পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এই জায়গাটি আজও এক রহস্যময় দৃষ্টান্ত হিসাবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত। স্থানটি তুর্কমেনিস্তানের ইতিহাস এবং প্রাকৃতিক বিশালতার একটি চিরন্তন নিদর্শন হয়ে থাকবে। এটি শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি বিজ্ঞান এবং মানব সভ্যতার জন্য এক শিক্ষা। এটি প্রমাণ করে যে, পৃথিবী কতটা অদ্ভুত ও রহস্যময়।