সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: খাতায়-কলমে এখন শীতের বিদায়বেলা। যদিও প্রকৃতি আর কবেই বা হিষেবনিকেশ মেনে চলেছে! তাই শীতের এই লাস্ট ইনিংসের দুপুরজুড়ে এখনই চড়া রোদের চোখরাঙানি। এই বাজারে কচিৎ কদাচিৎ সরকারি এসি বাসের দেখা পাওয়া অনেকটা লটারি পাওয়ার মতো। এমনই এক দুপুরে অতি সৌভাগ্যক্রমে পাওয়া সরকারি এসি বাসে চেপে অফিস যাচ্ছিলাম। বাসটা নতুন। তাই এসি চলছে ভালোই। ঠান্ডার হালকা পরশে চোখদুটো প্রায় বুজে এসেছে। আচমকাই বিজাতীয় এক শব্দে আঁতকে উঠলাম। পাশের সিটে বসা এক বছর পঁচিশের যুবা মোবাইল ফোনে রিলস দেখছেন। হেডফোনের বালাই নেই। কয়েক সেকেন্ড পর পর স্ক্রল করছেন। ফলে রীতিমতো শব্দ-সন্ত্রাস। বেজায় চটে একটু কড়া করে সেকথা বলতে যাব... আচমকাই চোখ গেল মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। চোখ গেল তো গেল, একেবারে আটকেই গেল। হলিউডের দুই হার্টথ্রব—টম ক্রুজ আর ব্র্যাড পিটের একটা অ্যাকশন সিন চলছে সেখানে।
বিদেশের কোনো এক শহুরে আকাশসীমা ফুঁড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অগণিত বহুতল। তারই একটির ভাঙা ছাদের উপর ধুন্ধুমার লড়াইয়ে ব্যস্ত দুই মহাতারকা। কোরিওগ্রাফি আর ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল দেখে মনে হল, ‘মিশন ইমপসিবল’ ধাঁচের কোনো অ্যাকশন থ্রিলার হতে পারে। খুব বেশি হলে ১৫ সেকেন্ডের ক্লিপ। একটু ইতস্তত করে সহযাত্রী ছেলেটিকে মিষ্টি করেই বললাম, ‘এটা কি নতুন কোনো সিনেমার টিজার?’ উত্তরটা মনে হয় ছেলেটিরও জানা ছিল না। তিনি ভিডিয়োর ডেসক্রিপশনে ঢুকে চেক করে বললেন, ‘কোনো সিনেমার সিন না দাদা। এআই দিয়ে তৈরি করা বলছে। ভাবা যায়!’ ছেলেটির গলায় বিস্ময়ের সুর। আমার দশাও তথৈবচ। আরও বারচারেক সেই ভিডিয়ো ক্লিপ দেখলাম দু’জনে।
আইরিশ পরিচালক রুয়াইরি রবিনসনের তৈরি ভিডিয়ো ক্লিপটা দেখলাম বটে। কিন্তু ঠিক শান্তি হল না। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের এই নিখুঁত ভিডিয়ো ক্লিপটি আসলে এআইয়ের কারসাজি! অগত্যা শরণাপন্ন হলাম এক্সের (পূর্বতন টুইটার)। দেখি, সেখানে ট্রেন্ডিংয়ে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম—‘সিড্যান্স ২.০’। চীনা প্রযুক্তি সংস্থা বাইটড্যান্সের এআই ভিডিয়ো তৈরির টুল। বিস্তারিত জানতে শরণাপন্ন হলাম গুগলের। সেখানে ‘সিড্যান্স ২.০’ লিখে ক্লিক করতেই দেখি পর পর খবরের লিংক। তার কয়েকটা পড়তেই বোঝা গেল, মাত্র ১৫ সেকেন্ডের এই একটি ভিডিয়ো ক্লিপ এখন হলিউডের স্বপ্ননগরীর লক্ষ লক্ষ ডলারের সাম্রাজ্যে রীতিমতো আতঙ্কের চোরা স্রোত বইয়ে দিয়েছে।
বাইটড্যান্স যখন বাজারে প্রথম ‘সিড্যান্স’ এনেছিল, তখন তা খুব একটা হইচই ফেলতে পারেনি। সাধারণ ভিডিয়ো জেনারেশন টুলের মতোই তা ছিল কিছুটা কৃত্রিম, অপরিণত। কিন্তু সদ্য আত্মপ্রকাশ করা ‘সিড্যান্স ২.০’ এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছে চেনা সমীকরণ। আর সে প্রভাব এতটাই যে নড়েচড়ে বসেছে গোটা দুনিয়া। ‘সিড্যান্স’-এর এই পরিবর্তনকে শুধুমাত্র একটা আপডেট দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। এটা আসলে প্রস্তুতকারী সংস্থা বাইটড্যান্সের জন্য একটি ‘ডিপসিক মোমেন্ট’। যেভাবে ‘ডিপসিক’ এআইয়ের হাত ধরে সিলিকন ভ্যালিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল চীন, ঠিক সেভাবে ‘সিড্যান্স ২.০’ আঘাত হেনেছে হলিউডের দরজায়।
কীভাবে? তা বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে ‘সিড্যান্স ২.০’-এর বিশেষত্বকে। প্রযুক্তিগতভাবে এটি টেক্সট-টু-ভিডিও ও ইমেজ-টু-ভিডিও—দুই ক্ষেত্রেই কাজ করে। আপডেটেড ‘সিড্যান্স ২.০’-এর প্রধান বিশেষত্বই হল এর ‘ভিস্যুয়াল কন্টিনিউইটি’। আগে এআই ভিডিয়োতে চরিত্রগুলি মাঝেমধ্যেই বদলে যেত। কখনো কখনো ব্যাকগ্রাউন্ড কেঁপে উঠত। কিন্তু ২.০ ভার্সনে সেই সমস্যা প্রায় নেই বললেই চলে। টম ক্রুজের চোয়ালের পেশি নড়াচড়া করা থেকে শুরু করে ব্র্যাড পিটের চোখের মণি—সবই নিখুঁত। একেবারে আসলের মতো। যার জন্য ‘নো ফিল্ম স্কুল’-এর মতো বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলি গোটা বিষয়টিকে ‘আই-পপিং’ বা ‘চোখ ধাঁধানো’ বলে ব্যাখ্যা করেছে। বলা ভালো, বলতে বাধ্য হয়েছে।
এই প্রযুক্তি প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে আমেরিকার চলচ্চিত্র দুনিয়ায়। ‘ডেডপুল’-এর চিত্রনাট্যকার রেট রিস একটি সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, এই ভিডিয়ো দেখে তিনি আতঙ্কে শিউরে উঠেছেন। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, ‘না চাইলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের জন্য প্রায় সবকিছু শেষ হতে বসেছে।’ তাঁর মতো জনপ্রিয় চিত্রনাট্যকার কেন এমন ভয় পাচ্ছেন? কারণ, সিড্যান্স ২.০ শুধুমাত্র ভিডিয়ো তৈরির কোনো সামান্য টুল নয়। রিসের মতো দূরদর্শীরা বুঝতে পারছেন, সত্যিকারের সৃজনশীল মানুষের হাতে এই প্রযুক্তি সোনা ফলাবে। আর সেই সঙ্গেই তা টলিয়ে দেবে বছরের পর বছর ধরে টিকে থাকা হলিউডের মাল্টি মিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রির ভিত।
বিপদ আঁচ করতে পারছে হলিউডের প্রযোজনা সংস্থাগুলিও। তারা অবশ্য মহাভারতের দুর্যোধনের মতো। বিনা যুদ্ধে ‘সূচ্যগ্র মেদিনী’ থুড়ি ইন্ডাস্ট্রি ছাড়তে নারাজ। মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান চার্লস রিভকিন এবং সোনি পিকচার্সের মতো বড়ো স্টুডিওগুলি সরাসরি বাইটড্যান্সের বিরুদ্ধে ‘কপিরাইট লঙ্ঘন’ করার অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, এই চীনা এআই টুলটি কোনো অনুমতি ছাড়াই লক্ষ লক্ষ হলিউড সিনেমা এবং অভিনেতাদের তথ্য ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। সোনি পিকচার্সও এই ‘মেধা চুরি’র বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে স্টুডিওগুলির জোটে শামিল হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, যদি এভাবেই বিনা পরিশ্রমে মহাতারকাদের দিয়ে সিনেমা বানিয়ে ফেলা যায়, তবে পরিচালক, চিত্রগ্রাহক বা মেকআপ আর্টিস্টদের প্রয়োজন কোথায় থাকবে? আর যে মহাতারকাদের ছবিতে ব্যবহার করা হচ্ছে, আদতে তাঁদেরও তো কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ বিভিন্ন সিনেমায় তাঁদের অভিনয় বিশ্লেষণ করে সংগ্রহ করা তথ্য দিয়েই বানিয়ে ফেলা যাবে নতুন সিনেমা। আর তাও প্রায় নিখরচায় (এআই ব্যবহারের খরচ তো সিনেমার তুলনায় একেবারেই নগণ্য)। ফলে কর্মহারা হবেন বহু মানুষ। বন্ধ হতে বসবে গোটা ইন্ডাস্ট্রিই।
এই ছবিটার একটা উলটো দিকও আছে। মুদ্রার সেই বিপরীত পিঠটি কিন্তু বেশ রোমাঞ্চকর। সাধারণ মানুষ বা উঠতি ফিল্মমেকাররা কিন্তু এই প্রযুক্তিতে উল্লসিত। এতদিন যাঁদের মাথায় অসামান্য সিনেমার আইডিয়া ছিল, কিন্তু বাজেটের অভাবে তা পর্দায় আনতে পারেননি, ‘সিড্যান্স ২.০’ তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছে আলাদিনের প্রদীপ। এখন আর বড়ো স্টুডিওর দোরে দোরে ঘুরতে হবে না। প্রযোজকের পায়ে তৈলমর্দন করতে হবে না। নিজের কল্পনাকে ল্যাপটপের কিবোর্ডে টাইপ করলেই তৈরি হয়ে যাবে আস্ত একটা সিনেমা। সেই সঙ্গে সূচনা হবে ‘এআই ফিচার ফিল্ম’ যুগের।
সমালোচকরা যদিও এখনই ‘সিড্যান্স ২.০’ নিয়ে লাফালাফি করতে নারাজ। তাঁদের মতে, এ হল ‘এআই স্লপ’। গোদা বাংলায় ‘কৃত্রিম আবর্জনা’। কারণ এআই নিখুঁত হলেও মানুষের আবেগের সূক্ষ্ম ছোঁয়া অধরাই থেকে যাবে। হাজার চেষ্টা করলেও কৃত্রিম মেধায় তৈরি সিনেমা মানুষের মনের গভীরতাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
উৎসাহ, আলোচনা এবং সমালোচনা হবেই। সব সময়ই তা হয়ে এসেছে। কিন্তু ‘সিড্যান্স ২.০’-এর এই উত্থান আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে ‘ডিপসিক’-এর কথা। একটা বিষয় স্পষ্ট, ফের পশ্চিমি দুনিয়াকে (মূল টার্গেট অবশ্যই আমেরিকা) ধাক্কা দিতে চীন এখন তার দ্বিতীয় ‘ডিপসিক মোমেন্ট’ চাইছে। এবারে তাদের তুরুপের তাস ‘সিড্যান্স ২.০’। খালি চোখে আমাদের এটাকে বিনোদনের একটা উপকরণ মনে হতে পারে। কিন্তু যদি বলি, এই এআই টুল দিয়ে হলিউডকে ধ্বংস করে আমেরিকার অর্থনীতিতে আঘাত হানার চেষ্টা করছে চীন, তাহলে বোধহয় খুব ভুল হবে না। কারণ হলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যদি এই এআইয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে মুখ থুবড়ে পড়বে হলিউডের এত দিনের ব্যবসা প্রতিপত্তি।
সেই সঙ্গে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ‘সফট পাওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য।
এই মুহূর্তে অবশ্য বাইটড্যান্স কিছুটা ব্যাকফুটে। প্রবল বিতর্কের মুখে কিছুটা সুর নরম করে তারা জানিয়েছে, মেধাস্বত্বকে সম্মান করতে তারা ‘সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার’ করছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে প্রস্তুতি চলছে আরও বড়ো কিছুর। শোনা যাচ্ছে, বিতর্কের মধ্যেই ‘সিড্যান্স ৩.০’ নিয়ে কাজ শুরু করেছে বাইটড্যান্স। এর লক্ষ্য আরও ভয়ংকর— ছোটো ছোটো ক্লিপের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সরাসরি ‘ফিচার ফিল্ম’ বা পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করা। অর্থাৎ, খুব শীঘ্রই এমন দিন আসতে চলেছে, যখন আপনাকে শুধু একটি চিত্রনাট্য আপলোড করতে হবে। তার পরেই ‘সিড্যান্স ৩.০’ আপনাকে আড়াই ঘণ্টার একটি মারকাটারি সিনেমা উপহার দেবে। প্রয়োজন পড়বে না লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন বলার। লাগবে না অভিনেতাদেরও। একেই বলা হচ্ছে ‘ফিচার ফিল্ম এরা’। যখন সিনেমা তৈরির সংজ্ঞাটাই চিরতরে বদলে দেবে এআই।
প্রশ্ন হল, এই পরিবর্তন নিয়ে কি আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ আছে? উত্তর হল—হ্যাঁ এবং না। দুশ্চিন্তার কারণ, সৃজনশীল পেশার মানুষের অস্তিত্ব সংকটে পড়তে চলেছে। তবে মোকাবিলা করার পথও কিন্তু প্রযুক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে। হলিউডকে এখন ‘এআই ওয়াটারমার্কিং’ বা আইনি সুরক্ষার দিকে ঝুঁকতে হবে। আসলে প্রযুক্তিকে থামিয়ে রাখার সাধ্য মানুষের নেই। চাকা আবিষ্কার থেকে শুরু করে ইন্টারনেট—প্রতিটি বিপ্লবই শুরুতে ভয়ের সৃষ্টি করেছিল। ‘সিড্যান্স ২.০’ বা ‘সিড্যান্স ৩.০’ হয়তো সিনেমা তৈরির ব্যাকরণ বদলে দেবে, কিন্তু মানুষের ভাষা একজন পরিচালক পর্দায় যে দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলেন, তা এআই দিয়ে তৈরি করা সম্ভব কি না, তা সময়ই বলবে।
টম ক্রুজ আর ব্র্যাড পিটের সেই ভাঙা ছাদের উপরে লড়াইটা আসলে আমাদের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। যেখানে বাস্তব আর মায়ার লড়াইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটা প্রম্পট। আমাদের তৈরি হতে হবে এক নতুন বিবর্তনের জন্য, যেখানে সিনেমা আর শুধু ক্যামেরার লেন্সে নয়, ধরা দেবে প্রম্পটের নির্দেশে। আর অত্যাধুনিক এক এআই বলে উঠবে—‘আমিই ইন্ডাস্ট্রি’। এবার আপনি সেই ‘ইন্ডাস্ট্রি’র পাশে কীভাবে দাঁড়াবেন বা আদৌ দাঁড়াবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকেই। দর্শকই ভগবান।