সবুজ বিশ্বাস, জঙ্গিপুর: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আলোকোজ্জ্বল ইতিহাসের পাতায় বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম চাপা পড়ে গিয়েছে। যাঁরা দেশের জন্য সপে দিয়েছিলেন জীবন। কিন্তু পাননি যথাযোগ্য পরিচিত। এমনই এক বিস্মৃতপ্রায় বীর বিপ্লবী মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের প্রথম শহিদ নলিনীকান্ত বাগচি। ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক কিংবা সেলুলয়েডের রূপালী পর্দায় তাঁর স্থান তেমনভাবে না হলেও, তাঁর আত্মত্যাগ আজও অনুপ্রেরণা জোগায় নতুন প্রজন্মকে।
১৮৯৬ সালে সামশেরগঞ্জের কাঞ্চনতলা গ্রামে জন্ম নেন নলিনীকান্ত। বাবা ভুবনমোহন বাগচির আদি নিবাস ছিল নদীয়ার শিকারপুরে। অতিদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এই মেধাবী ছাত্রটির উচ্চশিক্ষার পথ সুগম হয়েছিল স্থানীয় জমিদারের আর্থিক সহায়তায়। বহরমপুরের ঐতিহ্যবাহী কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি হওয়ার পরেই তাঁর জীবনে আসে মোড়। তৎকালীন সময়ে কৃষ্ণনাথ কলেজ ছিল অগ্নিযুগের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রধান অন্যতম কেন্দ্র। সেখানেই তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ পুলিশের নজর এড়াতে পাটনার বাকিপুর ও পরে ভাগলপুর কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যান নলিনীকান্ত। আইএ পাশ করার পরপরই সম্পূর্ণরূপে আত্মগোপন করেন তিনি। দানাপুরের সেনাছাউনিতে ভারতীয় সিপাহীদের মধ্যে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার নেপথ্যে ছিল তাঁর সক্রিয় ভূমিকা।
দলের নির্দেশে এরপর তিনি গুয়াহাটির আটগাঁওয়ের গোপন ডেরায় আশ্রয় নেন। ১৯১৮ সালের ১২ জানুয়ারি সেখানে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে এক তীব্র সশস্ত্র যুদ্ধ হয়। পুলিশের ঘেরাটোপ থেকে বিপ্লবী সতীশচন্দ্র পাকড়াশির সঙ্গে ছদ্মবেশে পালিয়ে চরম অসুস্থ অবস্থায় কলকাতায় আসেন নলিনীকান্ত। কিছুটা সুস্থ হয়েই নতুন আস্তানা গড়ে তোলেন ঢাকার কলকাতা বাজারে। কিন্তু রেহাই মেলেনি। ১৯১৮ সালের ১৫ জুন পুলিশ ঢাকার সেই গোপন আস্তানা ঘিরে ফেলে। দুই পক্ষের চরম গুলির লড়াইয়ে সহযোদ্ধা তারিণীপ্রসন্ন মজুমদার ঘটনাস্থলেই শহিদ হন। মারাত্মক আহত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয় নলিনীকান্তকে।
ঢাকা মিডফোর্ড হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার সময় ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা ও জাঁদরেল গোয়েন্দারা তাঁর প্রকৃত পরিচয় ও দলের খবর আদায়ের জন্য অমানুষিক অত্যাচার চালায়। কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী নলিনীকান্তের মুখ থেকে একটি শব্দও বের করা যায়নি। সমস্ত যন্ত্রণা সহ্য করে মৃত্যুর ঠিক আগে ইংরেজ পুলিশ অফিসারদের মুখের উপর গর্জে উঠেছিলেন এই তরুণ বিপ্লবী- ‘স্টপ ডগ, ডোন্ট ডিস্টার্ব মি। লেট মি ডাই ইন পিস।’ ১৬জুন রাতে ঢাকা জেলেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আত্মদানের এক শতাব্দী পেরিয়েও ইতিহাস হয়তো তাঁকে ভুলতে বসেছে, কিন্তু মুর্শিদাবাদের রক্তে তাঁর এই বীরগাথা আজও অমর। বিশেষ দিনে গ্রামেই তাঁর নামাঙ্কিত স্মৃতিস্তম্ভে দেওয়া হয় পুষ্পস্তবক। পশ্চিমবঙ্গ লেখ্যগারের কর্মী সুমিত ঘোষ বছর তিনেক আগে এই শহিদ বিপ্লবীকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সুমিতবাবু বলেন, নলিনী বাগচির মূল কর্মকাণ্ড ছিল মূলত বিহারে। পুলিশের অকথ্য অত্যাচারের পরও তিনি তা গোপন রেখেছিলেন। তাঁর সহ জেলবন্দিরা মৃত্যুর পরে তাঁর নাম প্রকাশ করেন।