


বিশেষ নিবন্ধ, সোমনাথ বসু: তাসকানি। মধ্য ইতালির শান্ত একটি অঞ্চল। এখানের এক সিমেট্রিতে শায়িত পাওলো রোসি। ফলকের পাশেই একটি গাছ। হলুদ ফুল ঝরে পড়েছে দক্ষ স্ট্রাইকারের কবরে। পাঁচ বছর ধরে একই জায়গায় রয়েছেন তিনি। জানেন কি, তাঁর দেশ ইতালি এখন ক্রিকেট খেলছে? শুধু তাই নয়, সদ্যসমাপ্ত টি-২০ বিশ্বকাপে নেপালকে ১০ উইকেটে হারিয়েছে আজ্জুরিরা? কিন্তু ফুটবলে ইতালির স্বর্ণযুগ এখন স্রেফ অতীত। কাতার ও রাশিয়া বিশ্বকাপে দেখা যায়নি নীল জার্সিধারীদের। ২০২৬’এ তারা অনিশ্চিত! আক্ষেপ কি করছেন তিনি? ভাবছেন, কেন তাঁর দেশ লড়ছে না? স্ট্রাগল... স্ট্রাগল... স্ট্রাগল... আর অপেক্ষা। এটাই তো বেঁচে থাকা। এটাই ফিরে আসা। মনে কি পড়ছে না আজ্জুরিদের তাঁর কথা? সেই ১৯৮২’র গ্রীষ্মের কথা...!
স্পেনের মাটিতে বিশ্বকাপের আসর। তাঁর নাম শুনলেই আঁতকে উঠতেন ইতালির ফুটবলপ্রেমীরা। ম্যাচ ফিক্সিং কাণ্ডে জড়িয়ে তিন বছরের নির্বাসন। পা থেকে বল সরে যেতেই ফিটনেসের অভাব। রোগা-পাতলা রোসি সেই সময় ভেবেছিলেন, ছেড়েই দেবেন প্রাণের প্রিয় ফুটবলকে। কিন্তু ভাগ্যিস তা হয়নি। সৌজন্যে এনজো বেয়ারজোত। সমালোচকদের সহস্র কটূক্তি সত্ত্বেও বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তিনি রেখেছিলেন রোসিকে। দেশের এক নামী দৈনিকের শিরোনাম ছিল, ‘রোসিকে নিয়ে ইতালিকে হারালেন বেয়ারজোত’। এখন সেই দৈনিক কালের গর্ভে। আর রোসি ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছেন।
কত কাগজ, কত বুমধারী বিশেষজ্ঞরা তো নাক কুঁচকেছিলেন ওই মেয়েটাকে নিয়েও। মাথা চাপড়েছিলেন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে... যাঃ, আর হল না। বড্ড ভালো ফর্মে ছিল প্রতীকা রাওয়াল। সেই কি না চোট পেয়ে বিশ্বকাপের বাইরে? সামনে সেমি-ফাইনাল। তাও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। একটু অন্যকিছু ভাবতে পারত না কি বোর্ড? শেফালি ভার্মা কেন? একের পর এক ব্যর্থতায় প্রথম একাদশের বাইরেই তো চলে গিয়েছিল। আবার ওকে কেন? বোর্ড কোনো উত্তর দিল না। অধিনায়ক হরমনপ্রীতও না। ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল শেফালির মেরুদণ্ড দিয়ে। এই নীরবতা যে ভরসার! আস্থার!
ফাইট... ফাইট... ফাইট...। টিভির সামনে বসে সেদিন কি শেফালিকে অলক্ষে বলে গিয়েছেন শ্যামলা বর্ণের এক তরুণও? বসে থাকা যে তাঁর অভ্যেস। টিভির সামনে। ড্রেসিং রুমে। ডাগ আউটে। সুযোগ পেলে ‘এ’ দলে খেলেন। আইপিএলেও। লোকে বলে, প্রতিভার খামতি নেই। অসম্ভব পরিশ্রমী। শুধু একটু ধারাবাহিকতার অভাব। সে তো তাঁর জায়গায় যাঁরা খেলেন, তাঁরাও রোজ ৫০-১০০ করেন না! ক্রাইসিস মুহূর্তে উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসেন। তাও বসে থাকেন শ্যামলা যুবক। অপেক্ষা করেন। আরও একটা সুযোগের। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-২০ সিরিজের পাঁচ ম্যাচে তাঁর রান ছিল ৪৬। ক্রিকেট বোদ্ধারা প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘কেন বয়ে বেড়ানো হচ্ছে একে?’ কেউ কেউ তো বলেছিলেন, ‘ওর জায়গায় নবীন ক্রিকেটারকে সুযোগ দিলে টিম ইন্ডিয়ার লাভ হবে।’ ৩১ বছর বয়সি সেই ক্রিকেটারও ভেবেছিলেন, নাঃ, আর বোধ হয় হল না। তাও হাল ছাড়েননি। কথা বলেছিলেন শচীন তেন্ডুলকরের সঙ্গে। রোহিত শর্মার সঙ্গে। শুরু করেছিলেন আরও বেশি প্র্যাকটিস। লড়াই। অপেক্ষা। ঈশ্বর তাঁর জন্য সত্যিই অন্যকিছু ভেবেছিলেন।
খেলার দুনিয়ার এই তিন চরিত্র কীভাবে যেন এক সূত্রে আজ বাঁধা পড়ে গিয়েছে। স্ট্রাগলের সূত্রে। ফিরে আসার সূত্রে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, লড়াই কখনও ব্যর্থ হয় না। অপেক্ষার কোনো বিকল্প হয় না। শুধু সঠিক সময়টা লাগে। ঠিক যেমনটা ছিল ১৯৮২’র ফুটবল বিশ্বকাপ। রোসির সময়।
প্রথম চার ম্যাচে গোল ছিল না রোসির। গ্যালারিতে ‘হায় হায়’ ধ্বনিতে কান পাতা দায়। কিন্তু হাল ছাড়তে নারাজ বেয়ারজোত। ৫ মার্চ বার্সেলোনায় দুর্ধর্ষ ব্রাজিলের বিরুদ্ধেও রোসিকে প্রথম একাদশে রাখলেন তিনি। ম্যাচ শুরুর আগে তাঁকে দেখেই আবার দুয়ো দেওয়া শুরু সমর্থকদের। রোসি অবশ্য কান দেননি। আর তাই সেই ম্যাচ পৌঁছেছিল অন্য উচ্চতায়। তাঁর দুরন্ত হ্যাটট্রিক জিকো-সক্রেটিস-ফালকাওদের হাতে ধরিয়ে দেয় দেশে ফেরার টিকিট। এরপর পিছনে তাকাতে হয়নি রোসিকে। সেমি-ফাইনালে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে জোড়া লক্ষ্যভেদ। খেতাব নির্ণায়ক ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির জালও কাঁপান তিনি। ঝুলিতে হাফ ডজন গোল এবং তার সৌজন্যে গোল্ডেন বল এবং গোল্ডেন বুট। এই কৃতিত্ব বিশ্বের আর কারো নেই।
শেফালির কৃতিত্বেই বা ক’জন ভাগ বসাতে পেরেছেন? অবিশ্বাস্য ৩৩৮ রান চেজের সেমি-ফাইনালে। আর শেফালি? ব্যর্থ। মাত্র ৫ বলে ১০। কাপ্তান আর সঙ্গে জেমাইমার চোয়াল চাপা লড়াই বের করে দিয়েছিল ম্যাচটা। নড়েচড়ে বসেছিল গোটা ভারত। আমাদের মেয়েরাও পারে। কিন্তু ড্রেসিং-রুমে বসে হাউহাউ করে কেঁদেছিল মেয়েটা। শেফালি। ভারতীয় ক্রিকেটের ‘লেডি বীরু’। কিন্তু হাল ছাড়েননি। আর একটা ম্যাচ তো আছে! এটাই স্ট্রাগল। বেঁচে থাকার। ফিরে আসার। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ওই ম্যাচে জ্বলে উঠল শেফালির ব্যাট। মাঠের চারদিকে শট নিয়ে ৮৭ রান। বল খরচ মাত্র ৭৫। তারপর বল হাতে ভেল্কি। ৭ ওভারে ৩৬ রান দিয়ে শেফালি তুলে নিলেন লুস ও কাপকে। প্লেয়ার অব দ্য ফাইনাল... কুঁচকানো নাকগুলো সব সিধে হয়ে গিয়েছে। বলছে, আমরা তো আগেই বলেছিলাম, শেফালিই রাইট চয়েজ। আর শেফালি? ধন্যবাদ জানাচ্ছেন ঈশ্বরকে... নিজের কাছে নিজে হেরে না যাওয়ার জন্য।
মরে যাওয়ার আগে হার নয়। এটাই তো বীজমন্ত্র প্রত্যাবর্তনের প্রত্যেক নায়কের। নাম যা খুশি হতে পারে... মহিন্দর অমরনাথ, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, শেফালি ভার্মা... সঞ্জু স্যামসন। ফুটবল ঈশ্বরের দরবারে বসে রোসি কি শুনেছেন কেরালাইট এই যুবকের কথা? নড়েচড়ে বসেছেন কি তিনি রবিবারের মোতেরার সেলিব্রেশনে? তাঁর মন্তব্যের প্রতিধ্বনিই তো শোনা গিয়েছে সেদিন ফাইনালের পর! বলছিলেন, ‘চোখের সামনে স্বপ্নটা ভেঙে যেতে দেখছিলাম। শচীন স্যার না থাকলে বোধহয় ফিরে আসতে পারতাম না। কঠিন সময়ে উনিই আমাকে বুঝিয়েছেন। সাহস জুগিয়েছেন। শনিবার রাতেও ফোন করেছিলেন আমাকে। জিজ্ঞেস করলেন, কেমন মনে হচ্ছে? ফাইনাল...। আর কয়েকটা পরামর্শ। আমার এই ইনিংসের জন্য। লড়াইয়ের জন্য।’
সঞ্জু বিশ্বনাথ স্যামসন। ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’ নাটকে আজ তিনিই মুখ্য ভূমিকায়। কখনও আজ্জুরি স্ট্রাইকারের ব্যাটন হাতে, কখনও তাঁর নাম জিমি, কখনও দাদা। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী তাঁর জয়গানেই ব্যস্ত। অথচ, সাংবাদিক সম্মেলনে ক্যাপ্টেন সূর্যকুমার যাদবই মজার ছলে বলেছিলেন, ‘কার জায়গায় খেলাব ওকে? অভিষেক বসবে? ঈশান? নাকি আমি?’ এখন সমালোচকদের মতো সূর্যও ঢোঁক গিলছেন। ভাগ্যিস, অভিষেক শর্মা ও ঈশান কিষানের ওপেনিং জুটি দাঁড়ায়নি। তাহলে তো সুযোগই পেতেন না বিশ্বকাপের নায়ক। সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারের পর ব্যাটিং অর্ডারে রদবদল। শিকে ছেঁড়ে সঞ্জুর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ৯৭ নট আউট, সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বোলারদের তছনছ করে ৮৯ এবং ফাইনালে অবিশ্বাস্য ৮৯। আপার কাট, শর্ট আর্ম পুল, ইনসাইড আউট ড্রাইভে বল গ্যালারিতে পৌঁছালে ক্রিকেটপ্রেমীরা উদ্বেল হয়েছেন। আর সঞ্জু? তাঁর ব্যাট শুধু তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে সমালোচকদের।
ফাইনালের পর সঞ্জুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, গত তিনটি ম্যাচেই অল্পের জন্য শতরান হাতছাড়া হয়েছে। আপশোস কি হয়? বিশ্বকাপের সেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে তাঁর উত্তর, ‘দলের জয়ই শেষ কথা, আমার সেঞ্চুরি নয়।’ আদর্শ টিমম্যান বলেই এই মন্তব্য করেছেন সঞ্জু। শুধু রানের নিরিখে তাঁকে মাপা যাবে না। সম্ভবও নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী যেভাবে তিনি গিয়ার শিফট করেছেন, তার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। তাই স্মৃতির ভল্টে পাকাপাকিভাবে ঢুকে যায় সঞ্জুর ওই ৮৯ রানের ইনিংসটা। কিউয়ি ক্যাপ্টেন স্যান্টনার কি সাধে বলেছেন, ‘আমরা সত্যিই অভাগা। টি-২০ বিশ্বকাপের জন্যই সেরাটা তুলে রেখেছিল সঞ্জু স্যামসন। ওর ইনিংসটাই দু’দলের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।’
পারফর্মাররা এমনই হন। জ্বলে ওঠার জন্য খুঁজে নেন সেরার সেরা মঞ্চ। কঠিন-কঠোর সমালোচনা তাঁদের বিদ্ধ করতে পারে না। কিংবদন্তিদের অধিকাংশ এমনই বিনয়ী। বলেন, দলের প্রয়োজনে শুধু নিজের কর্তব্য পালন করেছি। টিম গেমে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের মূল্য তেমন নেই। শত চাপ নিয়েও সহজাত এবং স্বাভাবিক পারফরম্যান্স মেলে ধরাই তাঁদের অভ্যাস। কোনো বেয়ারজোত, কখনও বা অন্য কারো অফ ফর্ম-চোট সাধারণকে অসাধারণ হয়ে ওঠার সিঁড়ি তৈরি করে দেয়। এভাবেই এগিয়ে চলে খেলা। লড়াই। বেঁচে থাকা। চিরন্তন হয়ে বারবার ধরা দেয় কবিগুরুর লেখনি, ‘শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ পরে/ওরা কাজ করে।’