Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মনুষ্যত্বের মরণ বিচলিত করেছিল সত্যজিতকে

‘সভ্য কারা জানেন? যারা একটা আঙুলের চাপে একটা বোতাম টিপে সমস্ত অধিবাসী সহ একটা শহর ধ্বংস করে ফেলে

মনুষ্যত্বের মরণ বিচলিত করেছিল সত্যজিতকে
  • ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশেষ নিবন্ধ, স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: ‘সভ্য কারা জানেন? যারা একটা আঙুলের চাপে একটা বোতাম টিপে সমস্ত অধিবাসী সহ একটা শহর ধ্বংস করে ফেলে। আর সভ্য তারা, যারা এই সিদ্ধান্ত নেয়।’ সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এর সংলাপ। এই সংলাপ তথাকথিত সভ্য মানুষের গালে সপাট থাপ্পড়ের মতো এসে পড়ে। অনিলার গৃহত্যাগী মামা মনমোহন মিত্র ৩৫ বছর পর দেশে ফিরে এসেছেন। যাঁর কোনো স্মৃতিই অনিলার নেই। তাঁর স্বামীর তো থাকার কথাই নয়। প্রায় সবাই তাঁকে সন্দেহ করছেন, এ জাল নয় তো! সেই মনমোহনের মুখেই আরও একটি সংলাপ ছিল— ‘যে জিনিস মানুষের মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে সেই ধর্মে আমার বিশ্বাস নেই। বিশেষ করে ‘অর্গানাইজড রিলিজিয়ন’ তো তা করেই।’ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমরা চারপাশে কী দেখতে পাচ্ছি? পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, যার ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছে, হাজার হাজার শিশু মারা পড়ছে। আর আমাদের দেশ সহ গোটা বিশ্বে দেখা যাচ্ছে ‘অর্গানাইজড রিলিজিয়ন’-এর পেশি আস্ফালন। যার বহিঃপ্রকাশ আমাদের দেশে দেখা গিয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্যে দিয়ে। উলটোদিকে সেই ‘অর্গানাইজড রিলিজিয়ন’-ই বারবার সীমান্ত পেরিয়ে আঘাত হানছিল কখনো কাশ্মীর, কখনো মুম্বইয়ের মাটিতে। বাবরি মসজিদ যে বছর ভাঙে, সেই বছরই ২৩ এপ্রিল প্রয়াত হয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। আর এ ছবি মুক্তি পেয়েছিল তার আগের বছর, অর্থাৎ ১৯৯১ সালে। অর্থাৎ ‘অর্গানাইজড রিলিজিয়ন’ যে তার বিষাক্ত ছোবল মারতে যাচ্ছে তা টের পেয়েছিলেন তিনি। 

Advertisement

তার আগের বছরই ১৯৯০ সালে মুক্তি পায় সত্যজিতের আরও দু’টি ছবি ‘গণশত্রু’ এবং ‘শাখা প্রশাখা’। এই তিনটি ছবির একটিও চলচ্চিত্র সমালোচকদের খুশি করতে পারেনি। কিন্তু ছবি তিনটির বিষয়বস্তুতে এক অদ্ভুত মিল আছে। যা এই ছবিগুলিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। সত্যজিৎ তিনটি ছবিতেই মূল্যবোধের অবক্ষয়কে তুলে ধরেছিলেন। কখনো তা রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, কখনো সামাজিক মূল্যবোধ। এই মিলের কারণেই এই তিনটি ছবিকে একটি ‘ট্রিলজি’ বলা যায়। 
‘ঘরে বাইরে’ ছবির শ্যুটিং চলাকালীনই হার্ট অ্যাটাক হয় সত্যজিতের। ব্যস, ডাক্তারের নিদান, আর বাইরে বাইরে ঘুরে শ্যুটিং করা যাবে না। যা করার স্টুডিওর ভিতরেই করতে হবে। ফলে সুস্থ হয়েই তিনি পরের ছবির বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিলেন এমন একটি নাটককে যার প্রতিটি দৃশ্য চার দেওয়ালে বন্দি— হেনরিখ ইবসেনের লেখা ‘অ্যান এনিমি অব দ্য পিপল’। নাটকটি একশো বছরেরও বেশি আগে লেখা, ১৮৮২ সালে। কেন এই নাটকটিকেই বেছে নিলেন তিনি? সত্যজিৎ তাঁর জীবনীকার ব্রিটিশ লেখক ও সাংবাদিক অ্যান্ড্রু রবিনসনকে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল একবার অন্তত মানুষের মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি, তার শরীরী ভাষাকে নিয়ে ‘খেলা’ উচিত। আমার অনেক ছবিতেই তো আমি প্রকৃতিকে বিভিন্ন ভাবে দেখিয়েছি। কিন্তু এই ছবিতে মানুষের মুখ, তার চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।’ কিন্তু শুধুই কি এই কারণে? কোথাও কি এই চূড়ান্ত সমাজ সচেতন শিল্পী, যিনি ‘হীরক রাজার দেশে’ বা ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর মতো ছবি বানিয়েছেন তাঁকে সমসাময়িক রাজনীতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ক্রমাবনতি পীড়া দিচ্ছিল না! ‘গণশত্রু’ ছবিতে তো রাজনৈতিক মূল্যবোধের অভাবকেই কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। এই ছবিতে ইবসেনের মূল টেক্সট থেকে বিচ্যুত হননি সত্যজিৎ। শুধু পটভূমি বদলেছেন। চণ্ডীপুরের সৎ চিকিৎসক অশোক গুপ্ত জানতে পারেন, সেখানকার অত্যন্ত জাগ্রত বলে পরিচিত মন্দিরের চরণামৃতে হেপাটাইটিসের জীবাণু পাওয়া গিয়েছে। কারণ, নিকাশির পাইপ ফেটে সংক্রমণ ঘটছে। সেই চরণামৃত প্রতিদিন হাজার হাজার লোক, শিশু, বৃদ্ধ পান করেন। তিনি মন্দির বন্ধ করে আগে সমস্যা মেটানোর নিদান দেন। কিন্তু তা বললে কী করে হয়! এই মন্দিরের সঙ্গে তো অনেকের স্বার্থ জড়িত। তার মধ্যে অন্যতম পুরসভার চেয়ারম্যান নিশীথ, যিনি অশোক গুপ্তের ছোটো ভাই এবং হাসপাতাল ও মন্দির কমিটির কর্তা। নিশীথ সহ একটা সংগঠিত চক্র চায় না যে, এই কথা পাঁচকান হোক এবং মন্দির বন্ধ হয়ে যাক। ফলে তারা ডাক্তার গুপ্তের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। হাসপাতাল থেকে ডাক্তার গুপ্তের চাকরি চলে যায়, স্থানীয় স্কুল তাঁর মেয়েকে শিক্ষিকার চাকরিতে রাখতে রাজি হয় না। তবে সংগঠিত রাজনৈতিক চক্রের বাধা সত্ত্বেও অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের সমর্থনে শেষপর্যন্ত তিনি এই লড়াইয়ে জয়ী হন। এবার মনে করুন সেই সময়টাকে— গত শতাব্দীর আটের দশকের শেষভাগ। দুর্নীতি আর অপশাসনের একের পর এক অভিযোগে বিদ্ধ পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বাম সরকার। শিক্ষায় দুর্নীতি, পাড়ায় পাড়ায় সিন্ডিকেট রাজ, তোলাবাজি। যার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে গিয়েছেন বামফ্রন্টেরই দশ বছরের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখা ‘আপিলা চাপিলা’-এ। স্বয়ং সত্যজিৎও তো সেই সব ঘটনা দেখছিলেন। আর তারপর যা ঘটল সে তো ভয়ংকর। ২০০৬ সালে স্রেফ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিঙ্গুরের প্রায় হাজার একর তিনফসলি কৃষিজমি জোর করে টাটাদের হাতে তুলে দিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতাই কি সব? সংখ্যালঘিষ্ঠ মানুষের কথারও তো দাম দিতে হয়। বুদ্ধদেববাবু তা না মেনে বুক চাপড়ে বলেছিলেন, ‘আমরা ২৩৫...।’ কৃষকের কাছে তার জমি যে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ সে কথা সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের হোতারা প্রায় কেউই মাথায় রাখেননি। কারখানা হলে পরিবার পিছু একজনই চাকরি পেত। তারপর? পরিবারের বাকি সদস্যরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াত? পরবর্তী প্রজন্মের কী হত? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না তাদের কাছে। 
যদিও সিঙ্গুরের ঘটনার অনেক আগেই সত্যজিৎ রায় প্রয়াত হয়েছিলেন। কিন্তু ‘গণশত্রু’ ছবিতে তো তিনি সেই গণতান্ত্রিক পরিসরের অভাবের কথাই বলে গিয়েছিলেন। ক্ষমতার জোরে নিশীথ এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা ডাক্তার গুপ্তের কথা মানতেই চায়নি! 
রাজনীতির মনোযোগী ছাত্র মাত্রই জানেন যে, সমাজনীতি চলে রাজনীতির পথ ধরেই। রাজনৈতিক মূল্যবোধের অধোগামিতা ব্যক্তির এবং সমাজের মূল্যবোধকেও অধোগামী করে। সত্যজিতের এই ‘ট্রিলজি’-র দ্বিতীয় ছবি ‘শাখা প্রশাখা’ সেই সামাজিক এবং ব্যক্তির মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কাহিনি। এই ছবিটিও মূলত চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ এবং বাকি দু’টি ছবির মতোই সংলাপ নির্ভর। ছবির মূল চরিত্র ৭০ বছরের আনন্দমোহন মজুমদার এবং তাঁর চার পুত্র ও তাঁদের পরিবার। আনন্দমোহন তাঁর কর্মদক্ষতা ও সততার বলে সামান্য শিক্ষানবিশ থেকে একটি অভ্র খনির পার্টনার হয়ে ওঠেন। শুধু তাই নয়, ঝাড়খণ্ডের ওই এলাকায় তাঁর গুণমুগ্ধরা একটি উপনিবেশের নাম তাঁর নামানুসারেই করেন। সারাজীবন আনন্দমোহন সততার পথ থেকে সরেননি। সত্তর বছরের জন্মদিনে আনন্দমোহনের হার্ট অ্যাটাক হয় এবং তাঁর তিন ছেলে যাঁরা শহরে থাকেন, তাঁরা সপরিবারে চলে আসেন বাবাকে দেখতে। একমাত্র মেজো ছেলে প্রশান্ত, যে মানসিক রোগী সেই বাবার সঙ্গেই থাকে। ছবি যত এগোয় ততই বোঝা যায় যে, আনন্দমোহন, যিনি এতকাল জেনে এসেছেন যে, তাঁর মতোই তাঁর ছেলেরাও সততার পথ ধরেই চলছে, তাঁরা আসলে অসৎ। বড়ো ও সেজো ছেলে দুজনেই নিজের কর্মক্ষেত্রে ও ব্যক্তিগত জীবনে অসততার আশ্রয় নিয়েছে। ব্যতিক্রম ছোটো ছেলে প্রতাপ। সে কর্মক্ষেত্রে অসততা দেখে দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে চাকরি ছেড়ে দেয় এবং যাত্রায় অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নেয়। নাতির থেকে সে সব কথা জানতে পারেন ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকা আনন্দমোহন। অর্থাৎ সত্যজিৎ দেখানোর চেষ্টা করেছেন কীভাবে একট গোটা সমাজের মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এবং তার জন্য বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই মানুষের। বরং অসততাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। সৎ মানুষকে বোকা বলে অভিহীত করা হচ্ছে। 
শরৎচন্দ্র তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পথের দাবী’-তে লিখেছিলেন, ‘মানুষের মরণ আমাকে বড় আঘাত করে না, করে মনুষ্যত্বের মরণ দেখলে।’ সত্যজিৎ রায়কেও মনুষ্যত্বের মরণ আঘাত দিয়েছিল। তারই ফসল তাঁর জীবনের শেষ তিনটি ছবি। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ