নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কোনওরকম লিখিত নির্দেশিকা ছিল না। ছিল না প্রোটোকল-ম্যানুয়ালও। ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ পর্যন্ত করে দেখা হয়নি। অথচ রাতারাতি ভোটার তালিকা ঝাড়াই-বাছাইয়ে ব্যবহার করা হল সেই সফটওয়্যারই। ‘দ্য রিপোর্টারস’ কালেক্টিভে’র এক তদন্তমূলক প্রতিবেদনে এমনই একটি রহস্যজনক সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিযোগ উঠল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। তাতেই বাংলায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে ‘সন্দেহভাজন’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। শুধু তা-ই নয়, এটির দৌলতেই মধ্যপ্রদেশে অন্তত ২ কোটি ৩৫ লক্ষ ভোটারের নাম উঠেছে সন্দেহজনক তালিকায়। প্রশ্ন উঠছে, এসআইআরের মতো একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কীভাবে কোনও নির্দেশিকা ছাড়াই এমন ‘রহস্যজনক’ সফটওয়্যার ব্যবহার হল? ব্যবহারের ছাড়পত্রই বা দিল কে?
খসড়া তালিকা প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ আগে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে সন্দেহভাজন ভোটারদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করে কমিশন। কিন্তু তার আগে সেটি একবারও পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়নি। কারণ, বিহারে সন্দেহজনক ভোটার চিহ্নিত করতে এই ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহারের খবর নেই। এসআইআরের দ্বিতীয় পর্যায়ে তাহলে কী ভিত্তিতে এটি ব্যবহার করা হল? তাছাড়া তালিকায় নাম থাকা কোনও ভোটারকে ‘সন্দেহজনক’ হিসাবে চিহ্নিত করা বা তাঁর ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে ‘ফিল্ড ভেরিফিকেশন’ বা সরেজমিনে তদন্ত করাটাই আইন। কিন্তু কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক সংস্থা তা না করে, একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে কীভাবে ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে? তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কিছু দিন পর অন্তত ৪২ লক্ষ ভোটারকে সন্দেহভাজন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দিনকয়েকের মধ্যে এই বিপুল সংখ্যক ভোটারকে কোন পদ্ধতিতে এবং কিসের ভিত্তিতে সন্দেহ তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হল? ধোঁয়াশা বজায় রেখেছে কমিশন!
এসআইআর শুরুর অনেক আগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বলতে শোনা গিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে শেষ এসআইআরের সঙ্গে বর্তমান ভোটার তালিকার ম্যাপিংয়েই অর্ধেক সমস্যার সমাধান হবে। নাগরিককে নয়, কমিশনই ভোটারকে চিহ্নিত করে যাবতীয় সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু বাস্তবে এহেন বক্তব্যের সম্পূর্ণ উলটোপথে হেঁটেছে কমিশন। এখন সফটওয়্যার-চিহ্নিত ব্যক্তিদেরই প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা ভারতীয় ভোটার!
কোনও ভোটারকে সন্দেহজনক মনে হলে, ইআরওদের হাতে ন্যস্ত ক্ষমতা প্রয়োগ হওয়াটাই দস্তুর। ইআরওরা সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত করে সমস্যার সমাধান করবেন। কিন্তু বাস্তবে আধিকারিকদের তেমনটা করতেই দেওয়া হল না। তাঁদের হাত থেকে এই ক্ষমতা কার্যত ছিনিয়ে, একটি রহস্যজনক সফটওয়্যারে ভরসা রাখল কমিশন। ফল স্বরূপ এখন প্রশ্নের মুখে কয়েক কোটি ভোটারের ভবিষ্যৎ!