অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: ঐতিহ্যের রথের সঙ্গে জুড়ে থাকে আভিজাত্য। এমনিতেই জগন্নাথ দেবের রথকে কেন্দ্র করে একটি পৌরাণিক পারিবারিক আবহ আছে। আবার, হুগলির মাহেশের রথের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে চারটি পরিবারের ইতিকথা। রথের সঙ্গে মিশে রয়েছে সেই পরিবারগুলির নানা আচার, নানা সংযোগ। শুরুর দিন থেকেই সেই পারিবারিক যোগসূত্র জুড়ে গিয়েছে। সেই পরিবারগুলি হল শেওড়াফুলির রাজ পরিবার, রিষড়ার কুমোর পরিবার, শ্যামবাজারের বসু পরিবার ও পাথুরিয়াঘাটার মল্লিক পরিবার। ওই পরিবারগুলির কেউ রথের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে, কেউ বা জগৎপতির জন্য ছত্র বা ছাতা ধারণ করে। কেউ আবার অভিষেকের জন্য ষাঁড়াষাঁড়ির বানের জল ধরে রাখেন। ৬৩০ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে এভাবেই জুড়ে রয়েছে পরিবারগুলি।
জানা গিয়েছে, অতীতে শেওড়াফুলির মহারাজ মনোহরচন্দ্র রায় রাজদণ্ড নিয়ে হাজির থাকতেন জগৎপতির স্নানযাত্রায়। ধরতেন ছাতা। সেই ঐতিহ্যকে স্মরণ করে প্রতি বছর মাহেশে আসেন শেওড়াফুলির রাজ পরিবারের উত্তরপুরুষরা। সঙ্গে নিয়ে আসেন রাজদণ্ড। শ্যামবাজারের বসু পরিবারের তরফে প্রতি বছর রথযাত্রার আগে রথ সাজিয়ে তোলার কাজ করা হয়। পরিবারের প্রতিনিধিরা ঐতিহ্য অনুসরণ করে জুড়ে থাকেন এই কাজের সঙ্গে। মাহেশের রথ একেবারে শুরুর দিকে কাঠের ছিল। ১২৯২ বঙ্গাব্দে লোহার রথ গড়ে দিয়েছিলেন বসু পরিবারের তদানীন্তন কর্তারা। সেটি এসেছিল বিলেত থেকে। ধাতব চাকা, পূর্ণাঙ্গ লোহার রথ, তাতে জুড়ে থাকে দু’টি ঘোড়া। সেগুলিও লোহার তৈরি। মাহেশে জগন্নাথ মন্দিরের সেবায়েতরাও বংশ পরম্পরায় জুড়ে আছেন দেব বিগ্রহের পুজোর সঙ্গে। নবীন সেবায়েত পিয়াল অধিকারী বলেন, বিলেতের মার্টিন বার্ন কোম্পানি এই লোহার রথটি তৈরি করেছিল। শ্যামবাজারের বসু পরিবার সেই রথ দিয়েছিল জগৎপতিকে। আজও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা রথযাত্রার সময় রথ সাজাতে উপস্থিত থাকেন। রাজদণ্ড নিয়ে ছত্রধর হন শেওড়াফুলির রাজ পরিবারের উত্তরপুরুষরা। রিষড়ার কুমোর পরিবার ও পাথুরিয়াঘাটার মল্লিক পরিবারও মাহেশের রথের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। তাই মাহেশের রথ, জগৎপতির দেবদেউল শুধু ঐতিহ্য নয়, আভিজাত্যের সাক্ষ্য আজও বহন করে।
সেবায়েতরা জানিয়েছেন, বর্তমান মন্দির সংস্কারে একদা রাজ্য সরকার আর্থিক সাহায্য করেছিল। কিন্তু তারও আগে দেবস্থান ও মন্দির সংস্কারের কাজ করেছিল পাথুরিয়াঘাটার মল্লিক পরিবার। সেই সুবাদে রথের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তাঁরাও। রথ থেকে মন্দির, রাজদণ্ড থেকে ছত্রধর হওয়ার পাশাপাশি আছে পূণ্যজলের ভূমিকাও। বছরের পর বছর ধরে সেই কাজ করে রিষড়ার কুমোর পরিবার। নবযৌবন উৎসবে কুমোর পরিবারের জল অতিআবশ্যক। ষাঁড়াষাঁড়ির বাণের সময় জল ধরে রাখেন কুমোর বাড়ির সদস্যরা। রথযাত্রা হয়ে গিয়েছে। এবার উলটোরথের প্রস্তুতি তুঙ্গে। তারই মধ্যে বাঙালির এক অনন্য মিলনমেলায় ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক ইতিহাস।