


ভারতের ভোটার সংখ্যা ১০০ কোটি ছুঁই ছুঁই! ভারতই পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। কিন্তু গণতন্ত্রের কোয়ালিটি কেমন? আন্তর্জাতিক মহল এই প্রশ্নে ভারতকে পাশ নম্বরও দিতে রাজি নয়। তার কারণ একাধিক: ভোটার তালিকা তৈরি থেকে ভোটগ্রহণ এবং গণনা পর্যন্ত রকমারি কারচুপির অভিযোগ বহুকালের পুরানো। হিংসামুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান ভারত শেষ কবে দেখেছে, তাও বলা মুশকিল। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয় নির্বাচনি প্রচার পর্বেই। খুনোখুনি হয় ভোটের দিন। নির্বাচনোত্তর দিনগুলিতেও অশান্তির আগুন জ্বলে দিকে দিকে। এখানেই শেষ নয়, বিধানসভা/লোকসভা গঠনকালেও অবাঞ্ছিত ঘটনা সামনে আসে। বিশেষ করে ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতিতে ঘোড়া কেনাবেচায় জোয়ার লক্ষ করা যায়। ধরা যাক, কেউ ‘এ’ দলের প্রতীকে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু গণনায় পরিষ্কার হল যে, সরকার গঠন করছে ‘বি’ দল। অমনি ‘এ’ দলের গুণধর বিধায়ক/সাংসদ ‘বি’ দলে যোগদানের জন্য বাহানা খুঁজতে থাকেন। শেষমেশ তিনি ‘উন্নয়নের অংশীদার’ হওয়ার জন্য ‘বি’ দলেই যোগদান করলেন। অমনি ভুলে গেলেন ‘বি’ দল এবং তাদের নেতানেত্রীদের মুণ্ডপাত করেছেন দুদিন আগেই! তাঁর সেই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত হয়েই বেশিরভাগ ভোটদাতা তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন।
এই পুরো কীর্তিটা যে এমনি এমনি হয় না, তা একটি বালকও জানে। এর পিছনে থাকে বিপুল টাকার খেলা। নির্বাচনি বিধিকে কলা দেখিয়ে অপরিমেয় টাকা খরচ হয় প্রথমে প্রচারে টেক্কা দেওয়ার জন্য। অতঃপর চলে ভোটের দিন বুথ দখল, রিগিং এবং গণনায় কারচুপির জন্য পেশিশক্তির প্রদর্শনী। সেসবও শুকনো ভালোবাসা বিলিয়ে পাওয়া যায় না। তার জন্যও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। কৌটে নেড়ে বা ভদ্রভাবে চাঁদা কেটে, এমনকি নির্বাচনি বন্ড থেকেও এই পরিমাণ টাকা জোগাড় করা অসম্ভব। তাই ভোটের আয়োজনে নামার আগে থেকেই নির্বাচন কমিশনকে এই ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়। সবচেয়ে নজরে রাখতে নগদ অর্থের লেনদেন। কারণ কালো টাকার লেনদেন হয় নগদেই। তাই যাবতীয় বেহিসেবি নগদ অর্থের লেনদেনের উপর কড়া নজর রাখার জন্য কমিশনের তরফে রাজ্য প্রশাসনকে একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ এই টাকাতেই পোষা হয় ক্রিমিনাল এবং বোমা, পিস্তল, পাইপগান প্রভৃতি মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র কেনা হয়। নির্বাচন ঘোষণার পর নজরদারির দায়িত্ব সরাসরি বর্তায় ইসিআই কর্তৃপক্ষের উপর। অতএব কমিশনের তরফে নিযুক্ত পুলিশ এবং গোয়েন্দা কর্তারা অপরাধ সম্ভাবনা রুখে দেওয়ার লক্ষ্যে বিশেষ সক্রিয় হন। যেমন গোয়েন্দা সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে যে, ভিন রাজ্যের নগদ টাকা ইতিমধ্যেই বাংলায় ঢুকতে শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। বাংলার সঙ্গে এছাড়া সীমানা ভাগ হয়েছে ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, অসম, সিকিম প্রভৃতি রাজ্যের। এছাড়া দক্ষিণে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর। বাংলার সীমানায় অবস্থিত রাজ্যগুলি দিয়ে বেআইনি নগদ টাকা ঢোকা শুরু হয়েছে বলে গোপন সূত্রে খবর রয়েছে পুলিশ এবং গোয়েন্দাদের কাছে। মূলত সড়ক পথে গাড়িতে এবং বিভিন্ন ধরনের ট্রেনেই এসব টাকা চলে আসছে কলকাতা শহরে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় সেসব পার্ক করা হচ্ছে। হাওলা কারবারিদের সক্রিয়তা লক্ষ করেছেন গোয়েন্দারা। তাদের মাধ্যমেই এসব টাকা দুষ্টচক্রের কাছে হাতবদল হয়ে থাকে।
২০২১ বিধানসভা এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার হয়। বেশিরভাগটাই এসেছিল ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড সীমান্ত পেরিয়ে। অসম সীমানা দিয়েও টাকা ঢুকেছিল উত্তরবঙ্গে। গোয়েন্দাদের কাছে খবর, এবার ভোট ঘোষণা হতেই সক্রিয় হয়েছে রাজ্যের পুরানো পাপীরা। হাওলা কারবারে ভিন রাজ্যের কাউন্টারপার্টদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে তারা। আগামী দিনে আরো বিপুল টাকা ঢোকানোর কৌশল ঠিক করতে বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপে তাদের নিরন্তর কথাবার্তা চলছে বলে খবর। সেখান থেকেই গোয়েন্দারা জানতে পারছেন, ভোটের জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা আসা শুরু হয়েছে গুজরাত, রাজস্থান, দিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে। এগুলি স্টোর করা হচ্ছে বাংলা-বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা সীমানায়। সেখান দিয়েই এই টাকা ঢুকবে বাংলায়। এমনকি অসম সীমানা দিয়েও টাকা এখানে ঢোকানোর প্ল্যান নেওয়া হয়েছে। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, অর্থায়ন রুখে দেওয়াকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে কমিশনকে। কারণ নির্বাচনে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এর উপরে বহুলাংশে নির্ভর করছে। নির্বাচনের পরিবেশ হিংসাশূন্য রাখতেও এই পরিকল্পনার পূর্ণ সাফল্য জরুরি। নির্বাচনে দুর্বৃত্তায়ন, অর্থায়ন রুখে দেওয়া থেকেই শুরু হতে পারে ভারতের আদর্শ গণতন্ত্রের উত্তরণ। আর এই কাজে ব্যর্থতার পরিণাম ইলেক্টোরাল অটোক্রেসির বদনাম বয়ে বেড়ানো।