নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: বাঁকুড়ার শাততোড়া থেকে সবজি নিয়ে প্রতিদিন আসানসোলে বিক্রি করতে আসেন দিলীপ কর্মকার। তাঁর সবজি বিক্রির উপর নির্ভর করে পেট চলে পরিবারের পাঁচজনের। তবে, দামোদরে জল বাড়লে বন্ধ হয়ে যায় নৌকা যাতায়াত। সেদিন আর শহরে যাওয়া হয় না। সবজিও বিক্রি করা সম্ভব হয় না। সবজির বোঝা নিয়ে স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসা দেখে মুখ শুকিয়ে যায় দিলীপবাবুর স্ত্রী সন্ধ্যার। সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই তখন চ্যালেঞ্জ হয় দম্পতির। এভাবেই বছরের পর বছর কাটছে দিলীপ কর্মকার, শিবু পালদের সংসার।
ভোর হলেই তাঁরা স্বপ্ন দেখেন, বাড়ির টাটকা সবজি শহরে গিয়ে বিক্রি করলে ভালো দাম পাবেন। শহর থেকে বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনবেন। সন্তানদের মুখে হাসি ফুটবে। কিন্তু, সেই আশা অনেক সময়েই কেড়ে নেয় দুঃখের নদ দামোদর। কারণ এই এলাকার বাসিন্দাদের শহরে যেতে পার হতে হয় দামোদর। যার উপর নেই কোনো পাকা সেতু। বর্ষা ছাড়া অন্য সময়ে নদীর স্রোত কম থাকলে অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো তৈরি হয়। তাতেই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করা যায়। জলের তোড়ে প্রায় ভেঙে যায় অস্থায়ী সেতু। অনেক সময়ে বেশি খরচ দিয়ে নৌকা করে নদী পার হতে হয়। কখনো নৌকাও চালানো যায় না। তখন মাঠের সবজি মাঠেই নষ্ট হয়।
এত গেল চাষিদের কষ্ট, ওই এলাকার শ্রমিক পরিবারগুলিও একই অবস্থা হয়। দিনমজুরি করতে বা অস্থায়ীভাবে কারখানায় কাজ করতে বহু দরিদ্র পরিবারের মানুষ প্রতিদিন দামোদর পারাপার করে। ভোরে শিল্পাঞ্চলে এসে কাজে যোগ দেন। যেদিন নদীতে বান আসে, সেদিন আর কাজে যাওয়া হয় না। দিনমজুরদের গ্রামে মেলে না রোজগার। অনেকে তাই প্রাণ হাতে নিয়ে রেলব্রিজ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে বহু মানুষ ট্রেনে কাটা পড়েছে। তবু পেটের টানে মানুষ ছুটে যায় শহরে।
এই করুণ পরিস্থিতির শিকার আসানসোলের বার্নপুর সংলগ্ন বাঁকুড়া জেলার শালতোড়া গ্রামের বাসিন্দাদের। তাই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, এখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণের। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যেপাধ্যায় যখন জয়দেবে অজয়ের উপর সেতু তৈরি সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন এই এলাকার হাজার হাজার মানুষও আশায় বুধ বেঁধেছিল। এবার বুঝি দামোদরের পালা। কারণ এখানে সেতু হয়ে গেলে আসানসোল থেকে মুহূর্তেই পৌঁছে যাওয়া যাবে বিহারীনাথ পাহাড়ে। পর্যটনের বিকাশ হবে। নানা সম্ভাবনা থাকলেও তৃণমূল সরকার এই ব্রিজ তৈরিতে সম্মতি দেয়নি। প্রশাসনিক বৈঠকে এনিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে দাবি জানানো হলে অর্থ সংকট তুলে ধরে ব্রিজ করার সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। পূর্তমন্ত্রী থাকাকালীন তাও মলয়বাবু নিজ উদ্যোগে ব্রিজের সার্ভে করান। তারপরও কাজের কাজ কিছু হয়নি।
এই এলাকার পাশ্ববর্তী দু’টি বিধানসভা এলাকা আসানসোল দক্ষিণ ও বাঁকুড়া জেলার শালতোড়া দু’টি বিধানসভাই ২০২১ সাল থেকে বিজেপির দখলে। তাই হয়তো রাজনৈতিক অবস্থানের জেরেও তৃণমূল সরকারের বিমাতৃসুলভ আচরণ ছিল, এমন অভিযোগ বার বার তুলে সেতুর দাবিতে সরব হয়েছেন দুই বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল ও চন্দনা বাউরি। এবারও তাঁরা বিধায়ক হয়েছেন। তার মধ্যে অগ্নিমিত্রা মন্ত্রী। এবার জিতে দু’জনেই জানিয়েছেন তাঁদের প্রথম কাজ দামোদরে সেতু নির্মাণ করা। এখান তাঁদের মুখ চেয়ে রয়েছে হাজার হাজার দরিদ্র পরিবার। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা বলেন, দামোদরের উপর সেতু নির্মাণ করাবই।