


রাজদীপ গোস্বামী, শালবনী: ‘কাজের বেলায় কাজী, কাজ ফুরালে পাজি’—প্রবাদটি তাঁদের জীবনের সঙ্গে এভাবে মিলে যাবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি জঙ্গলমহলের নীরিহ আদিবাসী পরিবারটি! বৃহস্পতিবার তাই আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘সেই যে খাওয়া-দাওয়া সেরে ওঁরা চলে গেলেন, গত পাঁচ বছরে আমাদের কোনো খোঁজই নেননি কেউই! উল্টে তৃণমূল পঞ্চায়েত থেকে পাওয়া বাড়ির দেওয়ালে লিখে গিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা। এখন বুঝতে পারছি, আমাদের মতো দীন-দরিদ্রের ঘরে এসে জঙ্গলমহলের আবেগ ছুঁতে চেয়েছিলেন ওঁরা।’
সময়টা ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর। কোভিড মহামারীর ক্রান্তিকাল থেকে সবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলা। ক’মাস পর বিধানসভার ভোট। সেদিন সকাল থেকেই শালবনী ব্লকের বালিজুড়ি গ্রামে ঝুনু সিংয়ের মাটির ছোট্ট বাড়ির সামনে উর্দিধারীদের ভিড়। বজ্র আঁটুনি নিরাপত্তা। সুন্দর করে নিকানো বাড়ির চার দেওয়ালে আদিবাসীদের শিল্প ঐতিহ্যের ছোঁয়া—আলপনা। মাঝখানে লেখা, ‘স্বাগতম’। বাড়িতে আসছেন স্বয়ং দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সঙ্গী তৎকালীন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ, দলের পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয়, বাংলার রাজনীতির ‘চানক্য’ মুকুল রায় সহ দলের একঝাঁক নেতানেত্রী।
শুধু আসছেনই না, ঝুনুর বাড়িতে সারবেন মধ্যাহ্নভোজও। জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা কাঠের জ্বালানির হেঁশেলে হরেক রান্নার প্রস্তুতি। তদারকিতে ঝুনুর স্ত্রী ঝামুনা। মেনুতে স্যালাড, ভাত, রুটি, শাকভাজা, আলুভাজা, ডাল, শুক্তো, পোস্ত। শেষপাতে শীতকালীন নলেন গুড়ের রসগোল্লা, মিষ্টি দই। বেলা ঠিক দু’টো। বিশাল কনভয় নিয়ে, সাইরেন বাজিয়ে ঝুনুর ঘরে সপার্ষদ ঢুকলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মাটির দাওয়ায় চাটাইয়ে বসে সারলেন দুপুরের আহার। ছবি উঠল দেদার। বিজেপির পেশাদারি আইটি সেল ছড়িয়ে দিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। উল্কার গতিতে ভাইরাল। রাতারাতি জঙ্গলমহলের ‘সেলিব্রিটি’ হয়ে উঠলেন এই আদিবাসী দম্পতি।
সেদিনের সেই মাটির বাড়ি আজ তৃণমূল পঞ্চায়েতের সৌজন্যে পাকা। উঠোনে মুখ শুকনো করে বসেছিলেন একসময়ের সিপিএম কর্মী ঝুনু। বাড়ির এককোণে অবহেলায় পড়ে সেই খাটিয়া। জরাজীর্ণ দশা সেটির।ঝুনু সেটা দেখিয়ে বলছিলেন, ‘ওই যে খাটিয়াটি দেখছেন, ওতে বসে খানিক বিশ্রাম নিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সারানোর টাকা নেই বলে ওভাবে পড়ে। পেটের ভাত জোগাড় করতেই হিমশিম অবস্থা!’ একই সঙ্গে তাঁর আক্ষেপ, ‘দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাড়িতে এসেছেন, খেয়েছেন। এটাই আমাদের একমাত্র প্রাপ্তি। এবার ব্রিগেডেও যাইনি। ওঁরা মিটিং-মিছিলে যাওয়ার জন্য ডাকে, যাই না। সরকারি প্রকল্পে রেশন পাই। স্ত্রী লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পান। খাটাখাটনি করে কোনওরকমে সংসার চলে যায়।’
ঝুনুর যন্ত্রণার কাহিনি সামনে আসতেই সরব তৃণমূল ও সিপিএম। মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতি তথা মেদিনীপুরের প্রার্থী সুজয় হাজরা বলেন, বিজেপির মুখ আর মুখোশ একদম আলাদা। ঝুনু সিং হাতে গরম উদাহরণ। মেদিনীপুরের সিপিআই প্রার্থী মণিকুন্তল খামরুই বলেন, বিজেপি দলটাই ধাপ্পাবাজদের। এরা গরিব মানুষের আবেগকে ছুঁয়ে কাজ হাসিল করে। তারপর কেটে পড়ে।’ যদিও মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি শঙ্কর গুছাইত বলেন, ‘মানুষের পাশে কারা রয়েছে, তার উত্তর দিয়ে দেবে ইভিএম।’
সেদিন ঝুনুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে মেদিনীপুরের সভায় গিয়েছিলেন অমিত শাহ। সেখানে ‘দাদা’ যোগ দিতেই স্লোগান ওঠে—‘অব কি বার, দোশো পার।’ আদিবাসী দম্পতিকে ‘কাজী’ সাজিয়ে খাওয়ার ছবি ভাইরাল করেও লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি অমিত শাহরা! -নিজস্ব চিত্র