শুভ দেববর্মা: ত্রিপুরায় ডবল ইঞ্জিন সরকারের রাজত্বকালে এক ভয়ংকর ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে। ত্রিপুরার বৈচিত্রময় ও বহুত্ববাদী মৌলিক কাঠামো, গণতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্রীয় সাধারণতন্ত্র, মুক্ত নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা সহ সংবিধানের প্রত্যেকটি ক্ষেত্র প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত ও অবদমিত। একদিকে গোটা দেশে যেমন মোদির একনায়কতান্ত্রিক ও আগ্রাসী সরকার হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে এবং অন্যদিকে আরএসএস ও সংঘ পরিবারের ধর্মান্ধ দুবৃত্ত বাহিনী ত্রিপুরার সমাজজীবনে পরিকল্পিতভাবে লাগাতার হিংসা সংগঠিত করছে। আজ সাম্প্রদায়িক ভাগ বাঁটোয়ারা, ঘৃণা ও বিদ্বেষের বিষ ছড়ানোর ফলে মণিপুর জ্বলছে। অগ্নিগর্ভ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত। ত্রিপুরার সর্বনাশ করে দিয়েছে বিজেপি। এমন অবস্থা স্বাধীনতা-উত্তর দেশে আর কখনও দেখা যায়নি।
ত্রিপুরায় ডবল ইঞ্জিন সরকারে স্বচ্ছ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি যে কতটা মিথ্যা, তার প্রমাণ কুমারঘাটের মনু নদীর উপর সেতু ভেঙে পড়ার ঘটনা। ঊনকোটির কুমারঘাটে মনু নদীর উপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত বামফ্রন্ট সরকার। ২০১৭ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর বিজেপি আমলে শুরু হয় এই সেতু নির্মাণের কাজ। শুরু থেকেই সেকাজে গুণগত মান বজায় রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সেই সেতুর বিরাট অংশ নির্মীয়মাণ অবস্থায় মাঝনদীতে ভেঙে পড়েছে। দুর্নীতিবাজ বিজেপি সরকারের ব্যর্থতার এটা একটা ছোট উদাহরণ। এই ‘কাটমানি’ সরকারের বিরুদ্ধে বামপন্থীরা আন্দোলনে নামলেই নেমে আসছে সংঘ পরিবারের হিংসাত্মক আক্রমণ।
নয়া ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বিজেপি। এক্ষেত্রে ত্রিপুরাকে পরীক্ষাগার হিসাবে ব্যবহার করছে। ২০১৮-র পর রাজ্যে যতগুলি নির্বাচন হয়েছে একটিও নির্বিঘ্নে, স্বাভাবিক পরিবেশ-পরিমণ্ডলে হয়নি। বিরাট সংখ্যক ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। ফ্যাসিস্টসুলভ সরকার গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার সংহার করছে। বেঁচেবর্তে থাকার জন্য মানুষ যাতে আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত করতে না পারে, তার জন্য একের পর এক আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে। সরকারি মদতে সন্ত্রাস অব্যাহত। আইনের শাসন বিপন্ন। এখন প্রায় প্রতিদিন প্রতিরাতে বিরোধী দলের কর্মীদের বাড়িঘর, দোকানে ভাঙচুর, আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে বামেদের পার্টি অফিস জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। গত ৫ বছরে ২৫ জনেরও বেশি বামকর্মী খুন হয়েছেন। ২০১৮-তে ফলাফল ঘোষণার পাঁচদিনের মধ্যে ৫ জন খুন হয়েছিলেন। আর তারপর সরকারের নির্দেশে চলেছে কয়েকশো পার্টি অফিস, গণসংগঠনের অফিস বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে কিংবা আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো বর্বর ঘটনা। মানুষ এই সরকারের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন।
গোটা ত্রিপুরায় এখন চলছে গেরুয়া সন্ত্রাস! বিজেপি শাসিত ত্রিপুরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা তলানিতে চলে গিয়েছে, তা টের পাওয়া যায় যখন ভৈরব মেলার সামান্য পুজোর চাঁদা নিয়েও একের পর এক সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে যায়। সংখ্যালঘুদের একের পর এক বাড়ি, দোকান ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে। উদয়পুর, কৈলাসহর ও ধর্মনগরে মিশ্র বসতি এলাকা বেছে বেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো চেষ্টা করেছে। এখনও করছে। সেইসঙ্গে নারীদের উপর যৌন হিংসা, গণধর্ষণের পরে খুন, নাবালিকা অপহরণ, গার্হস্থ্য হিংসা ইত্যাদি অপরাধের ঘটনা বেড়েই চলেছে। বিজেপির নেতা-কর্মী, স্বয়ং মন্ত্রীর ঘরের ছেলেরা যুক্ত থাকার কারণে পুলিশ মামলা নিতে চায় না। কুমারঘাট, কমলপুর গণধর্ষণকাণ্ড তার প্রমাণ। কোনো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয় না। মহিলা কমিশনের কোনো ভূমিকা থাকে না। প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পায় না। শুনলে অবাক হবেন, ডবল ইঞ্জিনের ত্রিপুরায় বিসর্জনের শব্দদানব রুখে আক্রান্ত হতে হয় খোদ পুলিশ অফিসারকেও। বাম জমানায় যা ছিল কল্পনাতীত। এরপরও সরকার বলছে, অপরাধ কমেছে। এটাই ওদের মিথ্যাচারের নমুনা।
গত ৮ বছরে রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকারের রাজত্বে সংবিধান ও আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে। লিঙ্গ আধিপত্য, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও পাচার বেড়েছে। চুরি, ছিনতাই, দুর্নীতি ও তোলাবাজি বেড়েছে কয়েকগুণ। যুব সমাজ ড্রাগের নেশায় ভাসছে। ‘রেগা’ প্রকল্পের সংকোচনের ফলে গ্রামে পাহাড়ে দেখা দিয়েছে কর্মহীনতা ও খাদ্যাভাব। সামাজিক ভাতা মাসের পর মাস বন্ধ। সরকারি চাকরি নেই। সবচেয়ে বেশি আক্রমণ ও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সংখ্যালঘু মুসলিম ও আদিবাসী জনজাতি মানুষেরা। টিটিএডিসিকে আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে। দখলকৃত বনজমির পাট্টা দেওয়া বন্ধ। ককবরক ভাষায় রোমান হরফ চালু করার দাবির প্রশ্নে সরকার নীরব। জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই। গণতন্ত্র আক্রান্ত। রাজ্যে বুলডোজার-রাজ চলছে। জনজাতি তিপ্রাসাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এই বিজেপি সরকার। ওরা আমার-আপনার ভোটের অধিকারও কেড়ে নিতে চায়। বামপন্থীরা তাই দাবি তুলেছে, গণতন্ত্র বাঁচাতে বিজেপিকে হারান। বিজেপি যে রাজ্যে মাথাচাড়া দিয়েছে, সেখানেই রাজনৈতিক আবহ উত্তপ্ত করেছে। পশ্চিমবঙ্গ তার প্রমাণ!
ত্রিপুরার বহু মানুষের মুখের ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে পূর্ববঙ্গের প্রভাব বেশি। কথার টানেই তা প্রকট। এই রাজ্যের গা ঘেঁষেই বাংলাদেশ। অনেককাল আগে থেকে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ত্রিপুরায় বসবাস করছেন। ত্রিপুরার দক্ষিণ জেলার সাব্রুম মহকুমায় চাটগাঁইয়া ভাষা, বিলোনিয়ায় নোয়াখালির, উদয়পুর-সোনামুড়া এলাকায় কুমিল্লা অঞ্চলের ভাষার টান রয়েছে। কমলপুর, কৈলাসহর, ও ধর্মনগর এলাকায় শোনা যায় শ্রীহট্টের বাংলা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা থেকে আগরতলায় এসে বসতি গড়েছেন বহু মানুষ। ফলে বাংলাদেশের এই দুই অঞ্চলের ভাষার সংমিশ্রণের ফলে ত্রিপুরার রাজধানীর বাসিন্দাদের বাংলাতে আলাদা টান রয়েছে। ফলে এই রাজ্যে বিজেপির ‘অনুপ্রবেশ’-এর তত্ত্ব খাড়া করা সহজ। আর সেই অনুপ্রবেশের গল্প ছড়িয়ে আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে বাংলাভাষী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর। যেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মানেই সবাই অনুপ্রবেশকারী! এটা ‘ফ্যাসিবাদ’-এর প্রতিচ্ছবি!
এই একই তত্ত্ব প্রয়োগ করে পশ্চিমবঙ্গেও জনবিন্যাস বদলে দিতে চাইছে বিজেপি। এসআইআরে লক্ষ লক্ষ সংখ্যালঘু মানুষের নাম বাদ দিয়েছে। বাংলার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। হিটলার করেছিল এথনিক ক্লিন্সিং বা ইহুদি জাতের নির্মূলীকরণ। আর বিজেপি-আরএসএসের কর্পোরেট হিন্দুরাষ্ট্রের অভিমুখে হল এক অন্য ধরনের নির্মূলীকরণ— ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে ফেলা। বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের অত্যন্ত মৌলিক সাংবিধানিক ভোটাধিকারকে ছিনিয়ে অধিকারহীন প্রজায় নিক্ষিপ্ত করার গভীর এক রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে। এত বড় বিপদ ও বিপর্যয়ের মোকাবিলা করা কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলার প্রতিটি নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে।
লেখক সাহিত্যিক, ত্রিপুরা (মতামত ব্যক্তিগত)