স্বার্ণিক দাস, ভাঙড়: ২০২৩ সাল। ভাঙড়ে পঞ্চায়েত ভোট। দৃশ্যটা ভাবলেই এখনও কেঁপে ওঠেন এলাকার মানুষ। মুহূর্মুহ বোমা বিস্ফোরণ, আইএসএফ-তৃণমূল সংঘর্ষ। নির্বাচন চলাকালীন চারজনের মৃত্যু। রাজনৈতিক সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয় পুলিশও।
স্বার্ণিক দাস, ভাঙড়: ২০২৩ সাল। ভাঙড়ে পঞ্চায়েত ভোট। দৃশ্যটা ভাবলেই এখনও কেঁপে ওঠেন এলাকার মানুষ। মুহূর্মুহ বোমা বিস্ফোরণ, আইএসএফ-তৃণমূল সংঘর্ষ। নির্বাচন চলাকালীন চারজনের মৃত্যু। রাজনৈতিক সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয় পুলিশও।
২০২৪ সাল। লোকসভা নির্বাচন। লোকসভা ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী এলেও ভাঙড় ছিল ভাঙড়েই। গড় চালতাবেড়িয়ায় পরপর বোমা বিস্ফোরণের ফলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিধানসভা এলাকায়। দু’দলের মধ্যে ফের সংঘর্ষে জখম হন একাধিক মানুষ।
পরপর দু’টি নির্বাচনে রক্তপাত দেখেছিল ভাঙড়। কিন্তু, এবার বদলা নয়, বদল এল চরিত্রে। এটা কোনো রাজনৈতিক ধারাপাত নয়। বরং, ছাব্বিশের নির্বাচনে ‘রণক্ষেত্রের’ তকমাকে ঝেড়ে ফেলল ভাঙড়। গত দু’টি নির্বাচনের একেবারে ১৮০ ডিগ্রি উলটো ছবি। বুথে বুথে লম্বা লাইন— সে হোক সকাল ৭টা, কিংবা বিকাল ৫টা। কাঁঠালিয়া, পাকাপোল, নওদাবাদ, বামুনিয়া, চকবড়ালি সহ ভাঙড় ১ ও ভাঙড় ২ নম্বর ব্লক— যেখানেই চোখ গেল, সেখানেই এই ছবি বড়ো শান্তির। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ যেন এক অচেনা নির্বাচন কাটাল ভাঙড়।
মহিলারা দেদার ভোট দিলেন। সকালের দিকে নির্বাচন প্রক্রিয়া শ্লথ থাকলেও, তা মোটে দমাতে পারল না ভাঙড়ের মা-বোন-ঠাকুমাদের। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। অনেকেই অপেক্ষা করলেন দেড় থেকে দু’ঘণ্টা। নির্বাচনের কয়েকমাস আগেই ভাঙড়ের দক্ষিণ বামুনিয়া গ্রামে বাজারের পিছনের বিস্ফোরণ হয়। তাতে জখম হন চারজন। এদিন সেই এলাকা ঘুরে দেখা গেল, বিস্ফোরণের কোনো প্রভাব নেই। ঘটনাস্থল থেকে ১৫০ মিটারের মধ্যে পূর্ব বামুনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই বুথে সকাল ৭টার পর ভোটারদের লাইন ক্রমেই বেড়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক জওয়ান বললেন, ভোটদান প্রক্রিয়া যথেষ্ট তাড়াতাড়ি হচ্ছে। কিন্তু, ওই বুথের ২২৫, ২২৬ নম্বর পার্টে লোক এসেই যাচ্ছেন। তাই লাইন কমছে না। কিন্তু, অন্য কথা বললেন ২২৫ নম্বর পার্টের ভোটার মনিরুল মোল্লা। তাঁর বক্তব্য, ‘দেড় ঘণ্টার উপর অপেক্ষা করছি। কিন্তু, লাইন এগচ্ছেই না’। সকাল ১১টা পর্যন্ত শ্লথ গতিতে ভোটদানের অভিযোগ ছিল ভাঙড়ের সর্বত্র। নির্বাচন কমিশন জানায়, তখন ভাঙড়ে ভোট পড়েছে মাত্র ৩২ শতাংশ। কিন্তু, ছবিটা বদলাতে শুরু করে বেলা ১১টার পর। কাঁঠালিয়া হাইস্কুলে গিয়ে দেখা গেল, মহিলাদের ভিড় আরও বেড়েছে। পাল্লা দিচ্ছেন পুরুষরাও।
তবে দুপুরের দিকে প্রাণগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে আইএসএফ প্রার্থী নৌশাদ সিদ্দিকিকে দেখে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন কিছু মানুষ। এ নিয়ে উত্তেজনা ছড়ায়। গাড়ি থেকে নেমে পড়েন নৌশাদ। সেই সময় নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানরা লাঠি চালিয়ে ভিড় হঠিয়ে দেয়। ভাঙড়ের তৃণমূল প্রার্থী শওকত মোল্লা ও আইএসএফ প্রার্থী নৌশাদ সিদ্দিকি এদিন চষে বেড়িয়েছেন ভাঙড় জুড়ে। দু’জনের মুখেই একটা কথা— ‘ভাঙড়ের মানুষ শান্তিতে ভোট দিন। কোনো অভিযোগ যেন এবার জমা না পড়ে, এটাই টার্গেট। যদিও কমিশনের অবজার্ভাররা বলছেন, আইএসএফ একাধিক জায়গায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে বুথ দখলের অভিযোগ করেছে। কিন্তু, সবই ভিত্তিহীন।’ ৪ মে ফলাফল যাই হোক, নির্বাচনে ভাঙড়ের চিত্র বদলানোয় জিতল গণতন্ত্র।