Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সিপিএমের দেউলিয়া চরিত্র

কেউ বলছে, সিপিএম আছে সিপিএমেই। আর একদলের বক্তব্য, জন্ম ইস্তক দলটার ঐতিহাসিক ভুলের শেষ নেই। সেই তালিকায় আরও একটা যুক্ত হলে মন্দ কী?

সিপিএমের দেউলিয়া চরিত্র
  • ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: কেউ বলছে, সিপিএম আছে সিপিএমেই। আর একদলের বক্তব্য, জন্ম ইস্তক দলটার ঐতিহাসিক ভুলের শেষ নেই। সেই তালিকায় আরও একটা যুক্ত হলে মন্দ কী? জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দেওয়া থেকে পরমাণু চুক্তিতে মনমোহন সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার। সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে বহিষ্কার করার হঠকারী সিদ্ধান্ত। সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণের দানবীয় প্রক্রিয়া। একের পর এক নির্বাচনে ভোট লুট। আরও কত কী? ওসবই ছিল সুসময়ের আহ্লাদ! বাংলায় বামেদের রাজ্যপাট খতম হয়ে গত ১৫ বছরে অস্তিত্বটাই যখন প্রশ্নচিহ্নের মুখে তখন টিকে থাকার নামে এমন ছেলেমানুষি ‘বিচ্যুতি’ তো নিতান্তই স্বাভাবিক! না হলে নিউটাউনের হোটেলে তৃণমূল, বিজেপি দুই শিবির ঘুরে আসা এক কট্টর সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বসবেন কেন মহান দলের মহান নেতা? না তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলা যাবে না। বলতে হবে পরিবর্তিত আর্থ সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রগতিশীল বিকল্প খোঁজার চেষ্টামাত্র। তিনি নীতিগতভাবে নিশ্চয় ঠিকই করেছেন, কিন্তু তাঁর এক স্যাঙাত যেভাবে বলছেন, বসেছেন বেশ করেছেন আবার বসবেন, কেন ল্যাজে আগুন লাগার ভয় পাচ্ছেন নাকি! তাতে দলটার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা হওয়া স্বাভাবিক। তাঁকে বলি, এই ল্যাজে আগুন আপনারা গত ১৫ বছর ধরেই বারবার লাগাচ্ছেন নানা অছিলায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দল ও সংগঠন জাগছে না, আরও নেতিয়ে যাচ্ছে ভোটব্যাংক। ওই আগুন ঘুরে এসে ছারখার করে দিচ্ছে বামপন্থীদেরই। এভাবে চললে আসন্ন নির্বাচনেও সিপিএমের হাতে থাকবে শুধু বার্নল আর পেনসিল।

Advertisement

কোন রাজ্য সম্পাদকের আমলে এরাজ্যে ৩৪ বছরের হার্মাদ সিপিএম শূন্যের কলঙ্কে নিমজ্জিত? উত্তরটা সবার জানা, কিন্তু পরিত্রাণের চিচিংফাঁক মন্ত্রটা কারো জানা নেই। একার শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর মুরোদ নেই বলেই দিশাহারা বামেরা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হাতড়ে বেড়াচ্ছে পায়ের তলার মাটি ফেরানোর ‘বন্ধু’! একটু প্রাসঙ্গিক হলেই যাঁকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া যাবে অনায়াসে। যেমনটি হয়েছিল সাতাত্তরের নাটকীয় উত্থানে। প্রফুল্ল সেন ও অজয় মুখোপাধ্যায়দের ঘাড়ে চেপে এসে ভুলে যেতে সময় লাগেনি বিশেষ। কিন্তু এবার কিছুতেই শিকে ছিঁড়ছে না। কিছুতেই জাল ছিঁড়ে বেরোবার পথ পাচ্ছে না দল। কেরল আর বেঙ্গল লাইনে মারামারিও ক্লিশে। দেওয়ালে পিঠ না ঠেকলে সমঝোতার ভিক্ষাপাত্র নিয়ে তৃণমূলের সাসপেন্ড হওয়া কট্টর সাম্প্রদায়িক নেতার সঙ্গে আলোচনায় বসবে আদ্যন্ত মার্ক্সবাদী দল! বেরিয়ে এসে বলবেন  ফ্রন্টে আলোচনা হবে। এই দেউলিয়াপনাও দেখতে হল ছাব্বিশের ভোটের আগে। প্রমাণ হল, রানিনগরে জিতে শূন্যের কলঙ্ক ঘোচাতে সেলিম সাহেব কতটা মরিয়া। যা খুশি করতে রাজি। বাবরি মসজিদের জিগিরে ভেসে যদি একটা আসন আসে! তিনি অতীতের হাতে বন্দি থাকতে চান না। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, সাম্প্রদায়িক পথই যদি বামেদের জিয়নকাঠি হয়, তাহলে সাম্য, প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের কথা সিপিএম নেতারা গলার শির ফুলিয়ে আজও বলেন কেন? বামপন্থার আদর্শ তো ধুলোয় লুটোপুটি আলিমুদ্দিনের প্রশস্ত চাতালে।

এমনিতেই সিপিএমের গঠনতন্ত্রে রাজ্য সম্পাদকদের ভোটযুদ্ধে লড়াই করা রীতিমতো বিরল ঘটনা। প্রমোদ দাশগুপ্ত, সরোজ মুখোপাধ্যায়, শৈলেন দাশগুপ্তর আমল থেকে হালের অনিল বিশ্বাস কিংবা বিমান বসুরা সংগঠন ছাড়া আর কোনো দিকে নজর দেওয়ার বিশেষ সুযোগই পেতেন না। ব্যতিক্রম নিশ্চয় সূর্যকান্ত মিশ্র। তিনিও হার নিশ্চিত জেনেও নারায়ণগড় থেকে পালিয়ে আর কোথাও দাঁড়াননি। বিমানবাবুর কথা আলাদা, তিনি আদ্যন্ত কমিউনিস্ট সন্ন্যাসী। কোনো মলিনতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। রাজ্য দপ্তরের ছোট্ট ঘরটিই আজীবন আশ্রয়। দল যখন ক্ষমতায় ছিল তখনো পদ, ক্ষমতার মণিমাণিক্যের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না, আর এখন মরা গাঙে তো প্রশ্নই ওঠে না। এই যখন পরিস্থিতি তখন দলের সংকটকালে একজন রাজ্য সম্পাদক কোন আক্কেলে এক একটা ভোটে ভিন্ন ভিন্ন জেলা থেকে নিজের পছন্দমতো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ছাড়পত্র আদায় করেন। এক জীবনে এতগুলো জেলা ঘুরে ভোট লড়ার সৌভাগ্য একদা বঙ্গেশ্বর জ্যোতি বসুরও হয়নি। ২০০৪ সালে উত্তর কলকাতা থেকে জয়ী হয়ে এমপি হয়েছিলেন ভালো কথা। পাঁচবছর পরে ওই আসনেই হারতে হয় তাঁকে। কলকাতার সঙ্গে নাড়ির যোগ, ভোটে দাঁড়ানোর সেখানেই শেষ। এরপর থেকেই তিনি এক একটা ভোটে এক এক জেলায় ছুটেছেন। চোদ্দো সালে রায়গঞ্জে ভাগ্য সাথ দিলেও পরেরবার হেরেছেন। একুশে আব্বাস ভাইদের সমর্থন পেয়েও হুগলির চণ্ডীতলায় তিনি পরাজিত হন শোচনীয়ভাবে। মুসলিম ভোট ভাঙেনি, বরং হিন্দু জনসমর্থনও দূরে সরে গিয়েছে। সেই সংখ্যালঘু ভোটভাগের মরীচিকায় চব্বিশের লোকসভা ভোটে তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ভোটের দিন রাতে ভিক্ট্রি সেলিব্রেশনের ছবিও আমরা দেখেছি নানা জায়গায়। শেষে ব্যর্থ হয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অধীর আর হুমায়ুনের দিকে। তিনিই শুধু নন, প্রায় সব আসনেই পার্টির প্রার্থীদের জামানত জব্দ হয়। এবার ভোট আসতেই তথাকথিত বিপ্লবীয়ানায় যবনিকা। সংখ্যালঘু ভোটের ভাগাভাগির অঙ্কই প্রধান। কিন্তু সেলিম সাহেবের এক রাতের বৈঠকে এরাজ্যের সংখ্যালঘুদের মন ফেরা অসম্ভব। অবশিষ্ট হিন্দু ভোটব্যাংকও না সরে যায়। শরিক আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক, সিপিআইও যারপরনাই অসন্তুষ্ট। নিট ফল? এবারও বঙ্গে বামেদের শূন্যের যন্ত্রণার উপশম হওয়া প্রায় অসম্ভব।

মনে আছে, ষোলো সালে পার্কসার্কাস ময়দানে বুদ্ধদেববাবু আর রাহুল গান্ধীর যৌথ সভায় কংগ্রেস ও সিপিএমের মালাবদল দেখে রসিক বুদ্ধিজীবীরা মুচকে হেসেছিলেন। সেই কটাক্ষ অট্টহাসিতে রূপান্তরিত হয়েছিল একুশের বিধানসভা ভোটের আগে। কলকাতা শহরের এক পাঁচতারা হোটেলে ধর্মনিরপেক্ষ আব্বাস সিদ্দিকির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন লাল পার্টির মহামান্য রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। ছোটো-বড়ো-মেজো বাম নেতারা বলতে শুরু করেছিলেন, এবার তৃণমূলের সংখ্যালঘু জনসমর্থনের দফারফা হতে চলেছে। ব্রিগেডে আব্বাস সাহেব মঞ্চে উঠতেই অধীর চৌধুরীর ভাষণ থামিয়ে দেওয়া হয়। মাইক তুলে দেওয়া হয় আইএসএফ নেতার হাতে! এমনই বিসদৃশ ঘটনার সাক্ষী ছিল দিনটি। উপস্থিত সেলিমভজা কিছু নেতা ছাড়া আর সবাই চমকে গিয়েছিল। তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক ভেঙে যাওয়ার খোয়াব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফল বেরোতেই চক্ষু চড়কগাছ। আইএসএফের সঞ্জীবনী সুধায় কাজ হয়নি। নিট ফল সিপিএম ২৬ থেকে কমে মহাশূন্য! উলটে সেলিমেরই পিঠে চেপে প্রথমবার বিধায়ক হলেন নৌশাদ সিদ্দিকি, মানে ভাঙড়ের আইএসএফের প্রার্থী। কংগ্রেস এবং সিপিএম দুই-ই শূন্য (০)। বুঁদির গড়ে একা কেল্লা রক্ষায় নৌশাদ।

আর এবার? এত ইস্যু, ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, পদে পদে দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও সেই মহাশূন্যতেই আটকে থাকার ভয় পাচ্ছে বীরপুঙ্গব বাম নেতৃত্ব। শূন্যের ভ্রুকুটি যত তাড়া করছে রাজ্য সম্পাদক ততই বেপরোয়া। সেই আতঙ্ক থেকেই গত কয়েকমাস তিনি অধিকাংশ সময় ঘাঁটি গেড়েছেন অধীরের গড়ে। যদি কোনোমতে শিকে ছেঁড়ে! মুর্শিদাবাদে ভোটের নিয়ন্ত্রক আর অধীর নন, এটা বুঝেই বিজেপির প্রিয় ওয়েস্ট ইন হোটেলে হুমায়ুন সমীপে সেলিম। শোনা যায়, তিনি এন্টালির এমএলএ থাকার সময়ই জেলা ও রাজ্য কমিটির কাছে সিপিএমের পার্কসার্কাস জোনাল কমিটি একটা চিঠি দিয়েছিল। সিপিএম জোনাল কমিটির অভিযোগ ছিল, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। চিঠি পেয়ে অনিল বিশ্বাস প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন, দলে ঝড় ওঠে। সেই ভদ্রলোকই আজ সিপিএমের প্রবল ক্ষমতাবান রাজ্য সম্পাদক। হুমায়ুনের সঙ্গে রহস্যময় বৈঠকই প্রমাণ, সিপিএম রাজনৈতিক ও আদর্শগতভাবে আজ কী অবস্থায়! হুমায়ুন কবীর বাবরি মসজিদ বানাচ্ছেন। তার জন্য দেদার টাকা তুলছেন। মিমের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। অভিযোগ, দাঙ্গা করে গত লোকসভা ভোটে অধীর-সেলিমকে হারিয়েছেন। তারপরেও হুমায়ুনের সঙ্গে মিটিং! জোট না হোক সেটিং—এই রাজনীতিকে নিশ্চয় বাম প্রগতিশীলরা নিন্দা করার বদলে কুর্নিশই জানাবে! বলবে, আর্দশ দিয়ে কী হবে যদি মহাশূন্যে দলটাই মিলিয়ে যায়।

আসলে ব্যাপারটা ব্যক্তি সেলিমের নয়। ব্যাপারটা সিপিএমের সামগ্রিক রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার। না হলে এই দুর্দিনেও পার্টির ভিতরকার দ্বন্দ্বে কোণঠাসা হতে হয় তন্ময় ভট্টাচার্যকে। মুশকিল হল, সিপিএম নিজেকে উদার প্রগতিশীল বামপন্থী বলে চিরদিন দাবি করে। কিন্তু সুভাষ চক্রবর্তীর মতো নেতাকেও পদে পদে অপদস্থ করা হয়েছে। মাথার ওপর জ্যোতি বসুর হাত না থাকলে  তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যেতেন। কেন সিপিএমকেই এদেশে বামপন্থী মতাদর্শের প্রধান মুখ বলে স্বীকৃতি দেন অনেকে, তা এক বিরাট রহস্য। সিপিএম কবে থেকে এই বাংলায় বামপন্থার ইজারা নিয়ে বসে আছে। বারবার এই একটা দলের বিচ্যুতিতে বিপদে পড়ছে সামগ্রিক বামপন্থাই। বিপদে পড়ছেন উদার বামপন্থীরা। কষ্ট হয় যাঁরা এখনো সিপিএমের মধ্যে আদর্শ খোঁজেন, তাঁদের জন্য। যদি আবারও শূন্যতেই থামতে হয় তাহলে দলের ৬২ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো সংকটের মুখে পড়তে হবে সিপিএমকে। সংখ্যালঘু ভোটের ছলনায় হিন্দু ভোটের বাকিটাও চলে গেলে জাতও যাবে, পেটও ভরবে না। নিশ্চয়ই সেদিন সবাই ধন্য ধন্য করবে সেলিম সাহেবের নামে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ