


সুকমল দালাল, বোলপুর: ২৬ জানুয়ারি শুধুমাত্র সাধারণতন্ত্র দিবস নয়, এটি ভারতের শিল্প, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চেতনার আত্মপরিচয়েরও দিন। এই প্রেক্ষাপটে বোলপুর-শান্তিনিকেতন হয়ে ওঠে এক অনন্য সাংস্কৃতিক পাঠশালা। যেখানে শিল্প কেবল সৌন্দর্যের চর্চা নয়, বরং মানুষের কথা বলার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের শান্তিনিকেতনে শিল্পচর্চার মূল দর্শন ছিল মুক্তি। মনের মুক্তি, সৃজনের মুক্তি এবং সমাজের মুক্তি। এই ভাবনাকে বাস্তবরূপ দেন কলাভবনের শিল্পীরা। নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেইজ প্রমুখ শিল্পীর হাতে শান্তিনিকেতনের শিল্প হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের জীবনকথা। তাঁদের আঁকা ছবিতে স্থান পায় চাষি, শ্রমিক, সাঁওতাল সমাজ, গ্রাম্য নারীর সংগ্রাম। যা সাধারণতন্ত্রে ‘জনতার ক্ষমতা’ ধারণার এক শিল্পরূপ।
এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রামকিঙ্কর বেইজের ভাস্কর্য। তাঁর ‘সাঁওতাল পরিবার’ বা ‘কলের বাঁশি’ কেবল ভাস্কর্য নয়, স্বাধীন ভারতের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এখানে শিল্পীর দৃষ্টি শহরের অভিজাত জীবনের দিকে নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের শ্রম, লড়াই ও মর্যাদাকে প্রাধান্য দেয়। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় চোখের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে শিল্পের গভীরতাকে উপস্থাপন করেছিলেন। বিশ্বভারতীর হিন্দিভবনের দেওয়ালে তাঁর আঁকা ভারতের অন্যতম বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যুরাল শিল্পকর্ম। যা মধ্যযুগীয় সাধুসন্তদের জীবন ও শিক্ষার এক মহাকাব্যিক চিত্র তুলে ধরে। এভাবেই শান্তিনিকেতনের শিল্প সাধারণতন্ত্রের সমতা ও সামাজিক ন্যায়ের বার্তা বহন করে।
ভারতীয় সংবিধান রচনাকালে কেবল আইনগত কাঠামোই নয়, দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই লক্ষ্যেই সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপি অলংকরণের দায়িত্ব দেওয়া হয় শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুকে। সেইসময় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ভারতের সংবিধানের নকশা বা অনুলিপির দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুকে। তিনি তাঁর শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের নিয়েই এই কাজ শুরু করেন। একবছর আগে ভারতীয় সংবিধানের নতুন সংস্করণে নীরবে সরিয়ে দেওয়া হয় নন্দলাল বসুর আঁকা ২২টি অলংকরণ ও নকশা। এর আগেও তাঁর আঁকা অশোকস্তম্ভের নকশা বদলে দেওয়া হয়েছিল। এসব নিয়ে নিন্দার ঝড় উঠলেও সেগুলি আর ফেরানো হয়নি। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি যেন সংবিধানের আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিল্পভাষা।
ঐতিহ্যবাহী কলাভবনের দেওয়ালচিত্র ও মুক্তাঙ্গনের শিল্পচর্চাও শান্তিনিকেতনের এক বিশেষ পরিচয় বহন করে। শিল্প এখানে কেবল গ্যালারির চার দেওয়ালে বন্দি নয়। তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। এই গণমুখী শিল্পভাবনাই সাধারণতন্ত্রের গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের শিল্পচর্চাকে যুক্ত করে। আজও শান্তিনিকেতনের শিল্পীরা সেই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন। আধুনিকতার প্রভাব এলেও মানুষের কথা বলার প্রবণতা এখানকার শিল্পে রয়ে গিয়েছে। সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে তাই শান্তিনিকেতন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভারতের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে আছে তার শিল্প, সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনকথায়।