আধুনিক বাংলার রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে নানা জানা-অজানা গল্প শোনালেন
বিশিষ্ট ত্বকরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবাশিস বসু।
আধুনিক বাংলার রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে নানা জানা-অজানা গল্প শোনালেন
বিশিষ্ট ত্বকরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবাশিস বসু।
কলেজ স্ট্রিট। কলকাতা তখনও ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। সদাব্যস্ত রাস্তায় লাইন ধরে আসছে একটি ট্রাম। হঠাৎ করেই মেডিকেল কলেজের গেট থেকে বেরিয়ে এল একটি ঘোড়ার গাড়ি। সওয়ার এক গোরা চিকিৎসক। তিনি মেডিকেলের প্রফেসরও বটে। কোচোয়ান আচমকাই গেট থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে আসায় ঘটে গেল দুর্ঘটনা। ট্রামের ধাক্কায় মরল ঘোড়া।
রেগে আগুন সাহেব। ঠিক করলেন ট্রাম চালকের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকবেন। ঘটনাচক্রে সে সময় মেডিকেলের গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক যুবক। তিনি মেডিকেলে পাঠরত, সবটাই দেখেছেন। সাক্ষী হিসাবে সাহেব ডাক্তার তাঁকে ডাকলেন। জানালেন, আদালতে জানাতে হবে কীভাবে সাহেবের গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছে ট্রামটি। পড়ুয়া তাঁর প্রফেসরকে সরাসরি বলে দিলেন, দোষ ট্রাম চালকের নয়। সাহেবের কোচয়ানই আচমকা মেডিকেলের গেট থেকে বেরিয়ে ট্রামের সামনে চলে আসেন। দুর্ঘটনার দায় কোচয়ানেরই। প্রফেসরের সাক্ষী হওয়ার ‘অনুরোধ’ প্রত্যাখ্যান! তাও নেটিভ ছাত্রের। ফুঁসে উঠলেন গোরা ডাক্তার। কিছু সময় পর মেডিকেলে পাঠরত যুবকটির পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করার দায়িত্ব পান ওই প্রফেসর স্বয়ং। ফল বেরতে দেখা গেল, অকৃতকার্য হয়েছেন নেটিভ ছাত্রটি। আবার পরীক্ষা দিতে হবে! একটা বছর নষ্ট। কলেজের অধ্যক্ষ কিন্তু মেধাবী ছাত্রটিকে বিশেষ পছন্দ করতেন। ডেকে বললেন, ‘বছর নষ্ট করার দরকার নেই। তুমি যাতে লাইসেন্সিয়েট ডিগ্রি (এলএমএস) লাভ করতে পার, সে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ছাত্রটি বিধানচন্দ্র!
আজ ১ জুলাই তাঁর জন্মদিন। আবার মৃত্যুদিনও বটে। তাঁর জীবন নিয়ে অজস্র লেখা রয়েছে। কোনো কোনো লেখক দাবি করেছেন, তিনি মহারাজা প্রতাপাদিত্যের বংশধর ছিলেন। তথ্যটি পুরোপুরি সঠিক নয়। তিনি প্রতাপাদিত্যের জ্ঞাতি ছিলেন। তবে সরাসরি বংশধর ছিলেন না। বিধানচন্দ্র ছিলেন ভবানীদাস রায়চৌধুরীর বংশধর। ইছামতী নদীর দু’পাড়ের দু’টি গ্রামে এই রায়চৌধুরীদের বংশের দু’টি শাখা ছিল। একটি টাকির রায়চৌধুরী বংশ, অন্যটি সাতক্ষীরার শ্রীপুরের রায়চৌধুরী বংশ। বিধানচন্দ্র ছিলেন শ্রীপুরের রায়চৌধুরী বংশের সন্তান। বাবা প্রকাশচন্দ্র রায় ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হন। বিধানচন্দ্রের ছেলেবেলা বা প্রথম যৌবন যে খুব সচ্ছলভাবে কেটেছে, বলা যায় না। যাই হোক, বিদেশ থেকে অসামান্য ফল করে ডাক্তারির উচ্চশিক্ষা লাভ করে ফিরে এলেন বিধানচন্দ্র। তাঁকেও প্রতিষ্ঠিত হতে স্ট্রাগল করতে হয়েছিল। সে সময় থাকতেন এক কামরার একটি ঘরে। কলেজ স্ট্রিট এবং এম জি রোডের সংযোগস্থলের বিখ্যাত দিলখুশা কেবিনের পূর্বদিকেই রয়েছে একটি বাড়ি। মালিক ছিলেন পতিতপাবন চট্টোপাধ্যায়। সেই বাড়ির একতলার পিছনদিকের একটি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন বিধানচন্দ্র। কিন্তু নিয়মিত ভাড়া দেওয়ার সামর্থ ছিল না তাঁর। যে মাসে পসার একটু ভালো হত, সে মাসে ভাড়া দিতেন।
ব্যক্তি বিধানচন্দ্রকে নিয়ে নানা গল্প ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁর মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প হল প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসক নীলরতন সরকারের ‘কন্যা’ কল্যাণী ও বিধানচন্দ্রের মধ্যে সম্পর্কের কথা। বলা হয়, একটি অনুষ্ঠানে নাকি কল্যাণীকে দেখে পছন্দ হয়ে গিয়েছিল বিধানচন্দ্রের। তিনি তখনও নবীন চিকিৎসক। আয় বিশেষ ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই বিধানচন্দ্রের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিবাহপ্রস্তাব নাকচ করেন নীলরতন। অপমানও নাকি করেছিলেন। সেই দুঃখেই নাকি চিরকুমার বিধানচন্দ্র পরে গঙ্গাতীরের ‘প্ল্যানড সিটি’র নাম রেখেছিলেন কল্যাণী। শুনতে আকর্ষণীয় লাগলেও এটি নিছক গল্পই। নীলরতনের কোনো কন্যার সঙ্গে বিধানচন্দ্রের প্রেমের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলেনি। এমনকি, ডাঃ নীলরতন সরকারের পাঁচ মেয়ে থাকলেও কারও নাম কল্যাণী ছিল না!
লিখেছেন সায়ন মজুমদার