সংবাদদাতা, তেহট্ট: ৪৮১ বছর আগের কথা। মুর্শিদাবাদ থেকে পুজোর প্রতিমা ও সামগ্রী নিয়ে এক ব্যক্তি জলপথে নদীয়ার হোগলবেড়িয়ার মধ্য দিয়ে অধুনা বাংলাদেশের ভেড়ামারায় যাচ্ছেন। একবার এই দুর্গা প্রতিমা ও পুজোর সামগ্রী নিয়ে নৌকায় যাওয়ার সময় ঘটে বিপত্তি। হোগোলবেড়িয়ার নস্করীতলার কাছে প্রচণ্ড দুর্যোগ হয়। দুর্যোগের মুখে পড়ে বাংলাদেশের ভেড়ামারা গ্রামে পুজো করা ওই ব্যক্তি নস্করীতলার কাছে মহাদেব নস্কর নামে এক সাধুর ডেরায় আশ্রয় নেন। কৃষ্ণানবমীতে দেবীর বোধন হবে অথচ দুর্যোগ কমছে না দেখে ওই ব্যক্তি চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবতে থাকেন, আর এবার হয়তো মায়ের পুজো হবে না। বিষাদভরা মনে রাতে ঘুমাতে যান। সেই রাতেই তিনি দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে বলেন, এখানেই আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা কর। শেষমেশ মহাদেব নস্কর সন্ন্যাসী হওয়ায় তাঁকে দিয়েই নস্করীতলায় এই পুজো করিয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। আর সেই থেকেই শুরু হয় হোগোলবেড়িয়ার নস্করীতলার মা নস্করীর পুজো। আজও এই পুজোর বোধন শুরু হয় কৃষ্ণা নবমীর দিন। মায়ের গায়ের বর্ণ অতসী।
হোগলবেড়িয়ার নস্করী মায়ের প্রতিমা বংশানুক্রমে হেমন্ত মালাকার তৈরি করেন। পুরোহিত আসেন বর্ধমানের হাড়গ্রাম থেকে। আগে চারদিন ধরেই মায়ের কাছে বলি হতো। এখন তা হয় না। পুরনো নিয়মানুসারে এখানও শাক্ত মতেই দেবীর পুজোপাঠ হয়। পাশাপাশি তেহট্ট মহকুমার ভট্টাচার্য বাড়ির মা দুর্গার আরাধনা অন্যতম বনেদি পুজো। বাড়ির পুজো হলেও একশো বছর আগে তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই সময় যুগল হালদার নামে এক বাসিন্দা পাড়ার সবাইকে নিয়ে সভা করে টাকা তুলে এই পুজো চালু রাখেন। এখন এটি সর্বজনীন পুজোয় পরিণত হয়েছে।
৪১৮ বছর আগে তান্ত্রিক সাধক জগবন্ধু ভট্টাচার্য এই পুজোর প্রচলন করেন। জগবন্ধুবাবু পঞ্চমুণ্ডির আসনে সিদ্ধিলাভের পর পুজো শুরু করেন। এখানও সেই পঞ্চমুণ্ডির আসন রয়েছে। পুরনো নিয়মানুসারে এখনও রথযাত্রার দিন মায়ের কাঠামো বাঁধার কাজ শুরু হয়। ষষ্ঠীর দিন মায়ের চক্ষুদান হয়। দশমীর দিন চিরাচরিত প্রথা মেনে পান্তাভাত,কচুরশাক দিয়ে মাকে ভোগ দেওয়া হয়। এই পুজোর সূচনা না হওয়া পর্যন্ত তেহট্টের কোনও পুজোই শুরু হয় না। আবার এই প্রতিমার বির্সজন না হলে অন্য কোনও বির্সজন হয় না। প্রথা মেনে দুর্গাপ্রতিমাকে জলঙ্গি নদীতে নিয়ে গিয়ে নৌকা করে ঘুরিয়ে বির্সজন দেওয়া হয়। কথিত আছে আগে এই পুজোয় মোষ ও পাঁঠা বলি হতো। কোনও একবার পুজোর সময় পাঁঠাবলির পর রক্ত না বেরিয়ে সাদা দুধের মতো তরল কিছু বেরোতে থাকে। তখন সবাই ভেবেছিলেন এবার মায়ের পুজোয় কোনও বিঘ্ন ঘটেছে। সবাই ভয় পেয়ে মায়ের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। রাতের বেলায় দেবী স্বপ্নাদেশ করেন, আজ থেকে এই পুজোয় সব ধরনের বলি বন্ধ। এখন থেকে ক্ষীরের পাঁঠা করে তাকে বলি দিতে হবে।