


দুবাই ও ওয়াশিংটন: সামরিক পরিকাঠামোর গণ্ডি ছাড়িয়ে এবার মরিয়া হামলা গ্যাস ও তৈলক্ষেত্রগুলিতে! মিসাইল ও ড্রোন হানায় জ্বলছে উপসাগরীয় দেশগুলির একের পর এক জীবাশ্ম-জ্বালানি কেন্দ্র। বিশেষত কাতারের বৃহত্তম এলএনজি প্লান্টই এবার আক্রান্ত। তার জেরে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল পিছু ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গেল। এই পরিস্থিতিতে ভারতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, ভারতে আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশই আসে কাতার থেকে।
হামলার শুরুটা করেছিল ইজরায়েল। দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাসফিল্ড, সাউথ পারসে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে। এরপরই প্রতিবেশী উপসাগরীয় আরব দেশগুলিকে পালটা নিশানা বানায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর। লোহিত সাগরে অবস্থিত সৌদির সামরেফ রিফাইনারিতে আছড়ে পড়েছে তেহরানের মিসাইল। এই শোধনাগারটি যৌথভাবে পরিচালনা করে সৌদি আরামকো এবং এক্সনমোবিল। এছাড়াও কাতার, কুয়েত, আমিরশাহির একের পর এক জ্বালানি কেন্দ্র এখন তেহরানের রোষের মুখে। এদিন কাতার প্রশাসন জানিয়েছে, তাদের রাস লাফান এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইরান। হামলা চলেছে কুয়েতের দুটি অয়েল রিফাইনারিতেও। আমিরশাহির উপকূলে একটি জাহাজকে দাউদাউ করে জ্বলতে দেখা গিয়েছে। কাতার উপকূলের কাছে অন্য একটি জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত বলে খবর। তেহরানের এই পদক্ষেপে রীতিমতো ক্ষুব্ধ প্রতিবেশী আরব দেশগুলি। তারাও এবার চলতি সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা।
জ্বালানি ক্ষেত্রে ইরানের ‘লাইফলাইন’ সাউথ পারস গ্যাসফিল্ডে ইজরায়েল হামলার পরই প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান— ‘এই হামলার পরিণতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। গোটা বিশ্বকেই হয়তো জ্বলতে হবে এর ফলে।’ তারপর থেকেই প্রতিবেশী আরব দেশগুলির একের পর এক জ্বালানি কেন্দ্র আক্রান্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে ইরানের সাউথ পারস গ্যাসফিল্ডে হামলার দায় থেকে দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করেছেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর সাফাই, ইজরায়েল যে ওখানে হামলা চালাবে আমাদের তা বিন্দুমাত্র জানা ছিল না। তবে একইসঙ্গে তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিতেও ছাড়েননি ট্রাম্প। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, ইরানের সাউথ পারস ফিল্ডে ইজরায়েল নতুন করে আর হামলা করবে না। তবে ইরান যদি কাতারের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা জারি রাখে, তাহলে আমেরিকার প্রত্যাঘাতে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সাউথ পারস।
হরমুজ প্রণালী বিপজ্জনক হয়ে পড়ায় নিজেদের তেলের বড় অংশই পশ্চিমে লোহিত সাগর দিয়ে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছিল সৌদি। কিন্তু লোহিত সাগরের বন্দর শহর ইয়ানবুতে অবস্থিত সামরেফ রিফাইনারিও যেভাবে ইরানের হামলার মুখে পড়ল, তাতে ওই রুটের নিরাপত্তা এখন প্রশ্নের মুখে। ইরানের বিরুদ্ধে সরব হয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, যেটুকু আস্থা অবশিষ্ট ছিল তাও শেষ হয়ে গেল। তেহরানের হামলার নিন্দা করেছে কাতার ও আমিরশাহিও।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অশোধিত তেলের দাম ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার বিশ্ব বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের অন্যতম বৃহৎ উৎস কাতারের পরিকাঠামোও আক্রান্ত। ফলে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা চরমে। কাতার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আক্রান্ত রাস লাফান এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রে আগুন নেভানো সম্ভব হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির কারণে এই কেন্দ্র ফের কবে খোলা যাবে, তা এখন অনিশ্চিত। স্বাভাবিকভাবেই ভারতেও এর বড়ো প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ কিরীট পারেখ বলেন, কাতার থেকেই ভারতের মোট এলএনজি আমদানির ২০ শতাংশ আসে। এর ফলে ভারতকে এবার বিশেষ করে শিল্প ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে গ্যাসের ব্যবহার কাটছাঁট করতে হবে।