


নয়াদিল্লি: দিল্লি থেকে বেঙ্গালুরু, কলকাতা থেকে বরোদা। প্রতিদিন ডিজিটাল অ্যারেস্টের শিকার বহু। অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীরাই প্রতারকদের সহজ টার্গেট। অচেনা নম্বর থেকে ফোন। আর ধরা মাত্র পুলিশ পরিচয় দিয়ে হুমকি, ‘আপনার ফোন নম্বর সন্ত্রাসমূলক কাজে ব্যবহার হয়েছে’। এই ফাঁদে পা দিলেই সব শেষ। ‘ডিজিটাল অ্যারেস্টে’র নামে ফাঁকা হয়ে যাবে অ্যাকাউন্ট। এমনই এক ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। সোমবার সেই মামলার শুনানিতেই তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হল দেশের ব্যাংকগুলিকে।
‘প্রতারণার দায় ব্যাংকগুলির উপরও বর্তায়’—এদিন এই বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। জানিয়েছে, সন্দেহজনক লেনদেন হলে গ্রাহকদের সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করা ব্যাংকের দায়িত্ব। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানায়, ‘একজন অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী সাধারণত মাসে ১০-২০ হাজার টাকা তোলেন। সেখানে হঠাৎ যদি ২৫ লক্ষ, ৫০ লক্ষ বা ১ কোটি টাকা লেনদেন হয়, তাহলে ব্যাংককেই বিশেষ অ্যালার্ট পাঠাতে হবে।’ বেঞ্চের প্রশ্ন, ‘এআই ব্যবস্থা গ্রাহককে সতর্ক করে না কেন? সন্দেহজনক লেনদেনের একটা স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকা জরুরি। ব্যাংকগুলিকে তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে, কাগজে-কলমে নয়।’ বেঞ্চের অন্যতম সদস্য বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী কড়া ভাষায় বলেন, ‘ব্যাংকগুলো এতটাই ব্যবসায়িক মানসিকতায় চলছে যে, অপরাধীদের জন্য অর্থ পাচারের সুবিধাজনক মাধ্যম হয়ে উঠছে।’ তিনি সতর্ক করেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকও এই ধরনের অপরাধের অংশীদার হিসাবে বিবেচিত হবে।’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, এভাবেই বহু ক্ষেত্রে ব্যাংক আধিকারিকদের গাফিলতির সুযোগ নিয়ে প্রতারকরা বিপুল টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল আর বেঙ্কটরামানি জানান, ‘আরবিআই ইতিমধ্যেই ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ চিহ্নিতকরণ ও প্রতিরোধে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।’ তাতে ডিজিটাল অ্যারেস্ট কিন্তু কমেনি। বরং লাফিয়ে বাড়ছে। প্রতিদিন। সরকারি হিসাবই বলছে, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫’এর নভেম্বর পর্যন্ত সাইবার জালিয়াতির মাধ্যমে ৫৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে প্রতারকরা। এই প্রসঙ্গে বেঞ্চের মন্তব্য, ‘এটি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গুরুতর জাতীয় সমস্যা। এই ধরনের মামলায় দ্রুত তদন্ত, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা জরুরি।’
এই ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও টেলিকমিউনিকেশন দপ্তরের (ডিওটি) সঙ্গে পরামর্শ করে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোসিডিওর বা এসওপি তৈরির নির্দেশ কেন্দ্রকে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। পাশাপাশি, সিবিআইকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ সংক্রান্ত মামলাগুলি চিহ্নিত করার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। চার সপ্তাহ পর এই মামলার পরবর্তী শুনানি। তার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নতুন স্টেটাস রিপোর্ট জমা দিতে হবে। এছাড়া, ভবিষ্যতে ডিজিটাল অ্যারেস্টের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাস্তবসম্মত ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে বলে জানিয়েছে শীর্ষ আদালত। বেঞ্চের স্পষ্ট বার্তা, সতর্কতা না থাকলে প্রতারণা আরও বাড়বে, আর সেই দায় এড়াতে পারবে না ব্যাংকগুলোও।