শান্তনু দত্তগুপ্ত: কালে কালে নির্বাচন কমিশনও কি ভোটে লড়বে? এই প্রশ্ন ওঠে না। ওঠার কথাও নয়। কিন্তু এই বঙ্গদেশে এসআইআর নামক একটি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচি এমন প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে। আর কোনো বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ সেফোলজিস্ট নয়, এমন জিজ্ঞাস্য বাংলার আম জনতার মুখে মুখে। কারা এই আম জনতা? তারা এক বেলা কাজে না গেলে মজুরি কাটা যায়। তারা পদবির জন্য ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে বাংলাদেশি তকমায় মার খায়। তারা দিনের পর দিন শুনানির লাইনেও দাঁড়ায়। ভোট দিতে পারবে কি না, সেই উদ্বেগে নয়! নাগরিকত্ব চলে না যায়... এই আশঙ্কায়। কারণ তাদের মনে আতঙ্ক দানা বাঁধতে শুরু করে দিয়েছে। দেশের নানা প্রান্তে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি তাদের এমন ভাবতে বাধ্য করছে। তারা চিৎকার করে বলছে, আমরা বাংলাদেশি নই। ভারতীয়। শত শত বছর ধরে আমাদের এদেশেই আছি। তাও তাদের প্রমাণ দিতে হচ্ছে... তারা বাংলাদেশি নয়। কেন? এটাই যে বাংলার ভোটে বিজেপির এজেন্ডা! এটাই তো আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রচার। কর্মসূচিও তাই এঁকে বেঁকে চলেছে সেই পথে। নোটিস দেওয়ার জন্য প্রায় ৪ লক্ষ ভোটারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দেড় কোটির উপর বঙ্গবাসী শুনানিতে ডাক পাচ্ছেন। গালভরা নাম একটা আছে বটে, লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি। ২০০২ সালে আপনার নাম অসিত কুমার মিত্র ছিল, এখন কেন অসিত মিত্র? কুমার কোথায় গেল? অ্যাডমিট কার্ডে আপনার পদবি বন্দ্যোপাধ্যায়, ভোটার কার্ডে কেন ব্যানার্জি? আপনার নাম আগের এসআইআরে মহম্মদ ছিল, এখন কেন এমডি? আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এদের ‘সন্দেহজনক’ ভোটার হিসাবে চিহ্নিত করেছে। তাই শুনানিতে ডাক। এআইয়েরই বা দোষ কী? তাকে যা ফিড করা হয়েছে, সেই মতো আউটপুট দিয়েছে সফটওয়্যার। কিন্তু সত্যিই কি এই ‘তলব’ যুক্তিগ্রাহ্য? কমিশনের হয়ে যাঁরা এ রাজ্যে কাজ করছেন, তাঁদের কি বাংলার নাম-পদবি-সংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানটুকুও নেই? নাকি বাস্তবেই নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের ধামাধরা কারবার চলছে? আর এতগুলো প্রশ্ন উঠছে বলেই আজ হস্তক্ষেপ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। বলা ভালো, বাধ্য হয়েছে। বলেছে, ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি’ পরিস্থিতি। কারণ, কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে দোষারোপের পালা চলছে। লাগাতার। কারণ, এ রাজ্যেই একমাত্র সাধারণ মানুষের হয়রানির খবর অন্য সব শিরোনাম ঢেকে দিচ্ছে। কারণ, এ রাজ্যেই একের পর এক জেনুইন ভোটার আত্মঘাতী হচ্ছে। ৮৪ বছরের হাবিবা খাতুন এসআইআর শুনানির লাইনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। হাঁটতে পারেন না তিনি। লাঠি বইতে পারে না তাঁর শরীরকে। তাও তাঁকে দাঁড়াতে হয়েছে লাইনে। সামনে আরও হাজার খানেক লোক। চার ঘণ্টা, পাঁচ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা। দাঁড়িয়ে আছেন হাবিবা খাতুনও। কে যেন বলেছিল, অসুস্থ-বয়স্ক মানুষদের বাড়িতেই কমিশনের লোক যাবে। তাঁর বাড়িতে যায়নি। কোথায় তার জন্য আবেদন করতে হবে, সেই ঠিকানাও বৃদ্ধা খুঁজে পাননি। বিডিও অফিসে বলেছিলেন... শুনেছেন, যাওয়ার মতো লোক নেই। আরামবাগের সফিকুল ও জাহাঙ্গিরও লাইনে দাঁড়িয়েছেন। সরাইঘাটা গ্রামে থাকেন তাঁরা। ১৫ কিমি দূরে এসেছেন নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণে। আসতেই পারেন। অনেকে আসছেন। কিন্তু অনেকের সঙ্গে যে সফিকুল বা জাহাঙ্গিরকে মেলালে চলে না! কারণ, তাঁরা দু’জনই দৃষ্টিহীন। ঘাটালের শেখ জাফর আলির বয়স ৭১ বছর। মাথায় ট্রাঙ্ক চাপিয়ে পৌঁছে গিয়েছেন শুনানি কেন্দ্রে। যত জন্ম শংসাপত্র, জমির দলিল, বাবার আধার কার্ড, চোদ্দ পুরুষের ডকুমেন্ট... সবই আছে তার মধ্যে। কারণ, তিনি আর আসতে চান না এখানে। দাঁড়াতে চান না লাইনে। মিটিয়ে দিতে চান ঝামেলা, একদিনেই। তিনি জানেন... ডাকা হচ্ছে তাঁর মতো অনেককেই। কাউকে দু’দিন। কাউকে তিনদিন। কাজ ফেলে তাঁরা আসছেন। লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সেইদিনের মতো মজুরিটা পাওয়া যাচ্ছে না। লাইনে দাঁড়িয়েই তাঁরা ভাবছেন, ঘরে চাল নেই। কেনার মতো টাকাও যে আজ হল না!
এরাই ভারত। আসল ভারত। আদি, চিরন্তন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নতুন ভারত নয়। এই নির্বাচন কমিশন কোন ভারতের প্রতিনিধি? চিরন্তন ভারতের? নাকি নতুন? সংবিধান তাকে দায়িত্ব দিয়েছে ভারতের অধিকার রক্ষার। কোনো ব্যক্তি বিশেষ বা দলের নয়। যদি সাধারণ মানুষকে উপার্জন, সুস্থতা এবং অধিকার খুইয়ে তালিকায় নাম তোলাতে হয়, তাহলে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। গুজরাতে এসআইআর হয়েছে। সেখানে ৬৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। কেউ মৃত, কেউ পাকাপাকিভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন, কারও হদিশ মেলেনি। ৬৮ লক্ষটা কম নয়! তাও কিন্তু সেখানে লাগাতার হয়রানির অভিযোগ ওঠেনি। একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেনি। সবচেয়ে বড়ো কথা, ৬৮ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার পরও অনুপ্রবেশকারী... ঘুসপেট... এইসব স্লোগান ওঠেনি। কেন উঠল না? ওই রাজ্যও তো সীমান্তবর্তী। পাকিস্তান থেকে লোকজন চুপিসারে এসে পশ্চিম সীমান্তের এই রাজ্যে ঘাঁটি গাড়েনি, সেই গ্যারান্টি কে দিয়েছে? সেই কাটাছেঁড়া কেন হয়নি? ডবল ইঞ্জিন রাজ্য বলে? অসমে কেন বাংলাদেশি-রোহিঙ্গা তাড়ানোর জন্য এসআইআর হল না? সেখানে কেন শুধু এসআর বা স্পেশাল রিভিশন হল? ডবল ইঞ্জিন রাজ্য বলে? উত্তর-পূর্বের ওই রাজ্যের নাগরিকদের কেন শুনানির লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়াতে হল না? কেন কমিশনের লোকজন প্রত্যেক বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করলেন? হুঁ হুঁ, বিজেপি সরকার বলে কথা! বাংলারই তো দোষ। এরা বিজেপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনে না। এরা ধর্মের রাজনীতি পছন্দ করে না। এরা উন্নয়ন বলতে মন্দির-মসজিদ বোঝে না। তার মাশুল তো দিতে হবেই। তারা দিচ্ছেও। বন্ধ হয়ে যাওয়া কেন্দ্রীয় প্রকল্পের হাহাকারে, এসআইআরের লাইনে। কমিশন তারপরও কতটা উদাসীন। কতটা নির্লিপ্ত। যেন ভাবসমাধি ঘটেছে। দিল্লির উচ্চ দরবার থেকে নির্দেশ না এলে এমনটাই চলবে। চক্ষুলজ্জা? ব্যাপারই নেই। দেশের শীর্ষ আদালত আঘাত করেছে সংবিধানের পরিপন্থী এই মানসিকতাতেই।
সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করায় কেউ জয় দেখছে, কেউ অশনিসংকেত। কিন্তু সাংবিধানিক একটি প্রক্রিয়ায় দেশের আইন ব্যবস্থাকে রিং মাস্টারের ভূমিকা পালন করাটাও কোনো ভালো বিজ্ঞাপন নয়। না, রাজনৈতিক দলের কথা হচ্ছে না। তৃণমূল কংগ্রেস হোক বা বিজেপি—রাজনীতি তারা করবেই। সেটাই তাদের পেশা, ধর্মও বটে। জীবনের নানা ওঠাপড়া থেকে ইস্যু খুঁজে তাকে ভোট পলিটিক্সে তারা কাজে লাগানোর চেষ্টাও করবে। কিন্তু কমিশন? জ্ঞানেশ কুমার মহাশয় একটু ভাবুন, সুপ্রিম কোর্টের এই কঠোর নির্দেশের ‘মণিহার’ আপনাদের সাজছে তো? এই নির্দেশ আর যাই হোক, কমিশনের জন্য মোটেই ভালো বিজ্ঞাপন নয়। বারবার অভিযোগ উঠছে আপনার বিরুদ্ধে—আপনি নাকি কেন্দ্রের শাসক দলের হয়ে কাজ করছেন। দিল্লির দরবারের উপরতলা থেকে যেমন নির্দেশ আসছে, সেইমতো শুধু এগজিকিউট করছেন। ভারতের মতো গণতন্ত্রে এটাও কি হজম হওয়ার মতো বিষয়? না, নয়। নির্বাচন কমিশন তৈরি হয়েছিলই নিরপেক্ষতার প্রশ্নে। শাসক-বিরোধী সবাই ভোটে লড়বে। তাতে আম্পায়ার হওয়ার জন্য। বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হলে তাতে কি আম্পায়ার ভারতের থাকে? নাকি পাকিস্তানের? তাঁরা তৃতীয় কোনো দেশের নাগরিক হলেই সেই দায়িত্ব মেলে। তৃণমূল-বিজেপির খেলায় কমিশনের বিরুদ্ধে যদি গেরুয়া শিবিরের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে, তাতে এই স্বশাসিত সংস্থার থেকে আম্পায়ার হওয়ার যোগ্যতা কেড়ে নেওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু হবে না। সুপ্রিম কোর্ট এতটা করেনি। শুধুমাত্র লাগাম পরিয়ে দিয়েছে। সরাসরি বলেছে, তোমার কর্মপদ্ধতিতে খুঁত আছে। সেটা এতদিনে যখন শোধরাতে পারোনি, এখনও আর পারতে হবে না। সেই কাজটা কলকাতা হাইকোর্ট নিযুক্ত জুডিশিয়াল অফিসাররাই করবেন।
প্যাটার্ন ভাঙছে আদালত। কমিশনের তৈরি করা প্যাটার্ন। বাছাই করা বাড়িতে শুনানির নোটিস পাঠানো বা বাদ দেওয়ার প্যাটার্ন। আর বদলাচ্ছে ন্যারেটিভ। বাঙালি মানেই বাংলাদেশি নয়। বাংলার সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দা মানেই রোহিঙ্গা নয়। এই দায়িত্বটা কমিশনের ছিল। পালন করছে সুপ্রিম কোর্ট। এটাই আশা আম আদমির। এখনও। সরকার যদি অন্যায় করে, আমাদের কাছে আইন ব্যবস্থা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট রয়েছে। হোক না এসআইআর! নাগরিকত্ব যাবে না।