Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

গল্প: সাবধানী

বাতিক ব্যাপারটা মানুষের প্রায় সহজাত বলা যায়। কত রকমের বাতিকই দেখা যায় । পরিষ্কার বাতিক, সন্দেহ বাতিক, সাবধান বাতিক।

গল্প: সাবধানী
  • ২৬ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০

উৎপল ভট্টাচার্য: বাতিক ব্যাপারটা মানুষের প্রায় সহজাত বলা যায়। কত রকমের বাতিকই দেখা যায় । পরিষ্কার বাতিক, সন্দেহ বাতিক, সাবধান বাতিক। আমি একজনকে চিনি যে রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে মাঝেমাঝেই পিছন ফিরে দেখত। কী দেখত তা অবশ্য বুঝতে পারিনি। আমার এক ডাক্তার বন্ধুকে দেখেছি দিনের বেলাতেও হাতে টর্চ নিয়ে ঘুরতে। তাতে কী সুবিধে হতো তা অবশ্য জানি না। সুদেববাবুকে ফেলা যায় সাবধানীর দলে। কত অকিঞ্চিৎকর ব্যাপারে যে তিনি কত সাবধানতা অবলম্বন করে থাকেন, তা না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। 

Advertisement

গড়িয়ার এই ফ্ল্যাটটা বছর দুয়েক হল কিনেছেন। বস্তুত বেশি সাবধানী হওয়ার দরুন তাঁকে বেশ কিছু টাকা গুনাগার দিতে হয়েছে। একে তাকে জিজ্ঞেস করেন। তিনজন ফ্ল্যাট কেনার স্বপক্ষে বলে তো চতুর্থজন উল্টো কথা বলে। এইভাবে বছরখানেক কেটে যায়। শেষে একদিন হঠাৎ এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়। সে ফ্ল্যাট কেনার ব্যাপারটা শুনে যা বলল তাতে সুদেববাবু একটু লজ্জায় পড়লেন। কথাটা তো ঠিক। সারা কলকাতায় আর তার আশপাশে এত ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে আর তাতে হাজার হাজার মানুষ দিব্যি থাকছে। তার মনে হল এই অতি সাবধানী হওয়াটা কোনও কাজের কথা নয়। ফ্ল্যাটটা শেষ পর্যন্ত কিনেই ফেললেন। কিন্তু তখন ফ্ল্যাটের দামও আগের থেকে একটু বেড়ে গিয়েছে।
সুদেববাবু বিয়ে করেননি। সংসারে তার এক বোন ছাড়া আর কেউ নেই। সেও শ্রীরামপুরে তার শ্বশুরবাড়িতে থাকে। বাড়িতে মানুষ বলতে তিনি আর তার কম্বাইন্ড হ্যান্ড অনন্ত। 
অনন্ত বাড়ির সব কাজই করে। রান্না করা, দোকান-বাজার করা। বরাবর এই চলে আসছে। তবু অনন্ত বাজার থেকে ফেরার পর রোজই জিজ্ঞেস করতেন, ‘মাছটা ভালো ছিল কী করে বুঝলি?’ উত্তরে অনন্ত একদিন একটু রেগেই উত্তর দিল, ‘জ্যান্ত মাছের আবার ভালো-মন্দ কী?’ 
 সুদেববাবু বললেন, ‘জ্যান্ত মাছেরও তো রোগ থাকতে পারে! রোগগ্রস্ত মানুষ কখনও দেখেসনি?’ 
শুনে অনন্তর মুখে উত্তর জোগায়নি।
সুদেববাবু এমনিতে পণ্ডিত মানুষ, একটা কলেজে ইকনমিক্স পড়ান। নিজে প্রচুর পড়াশোনা করেন। কিন্তু তাঁর এই অতিসাবধানী স্বভাবটা কমেনি, বরং বেড়েছে। 
বেশ কিছুদিনের ছুটি পাওনা ছিল। সুদেববাবুর ইচ্ছে হল হপ্তা দুয়েকের জন্যে কোথাও ঘুরে আসবেন। ঠিক করলেন হাজারিবাগ যাবেন। সেখানে তাঁর এক বন্ধুর বাড়ি আছে। সেখানেই উঠবেন। মুশকিল হল ফ্ল্যাট খালি রেখে যাওয়া নিয়ে। তাঁর সাবধানী সত্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলেন তাঁর অনুপস্থিতির কথাটা কাউকে জানাবেন না। নয়তো সুযোগসন্ধানীদের কানে খবরটা চলে যাবে। 
অনন্ত অবশ্য বলেছিল পাশের ফ্ল্যাটের সুশোভনবাবুদের আর সিকিউরিটিকে জানিয়ে গেলেই তো ভালো হয়। শুনে সুদেববাবু বলেছিলেন, ‘একদম না, সিকিউরিটির লোকেরাই ইনফরমারের কাজ করে। আর তুইও কাউকে বলবি না।’ 
অনন্ত বোঝাবার চেষ্টা করেছিল, যাদের সঙ্গে রোজ দেখা হয়, হঠাৎ পনেরো দিন না দেখলে তো নিজেরাই খোঁজ করবে। 
সুদেববাবু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তোর অত সবার সঙ্গে মাখামাখির দরকার কী?’ 
শেষপর্যন্ত কাউকে জানানো হল না। হাজারিবাগ যাওয়ার আগের দিন দামি জিনিস বা দরকারি কাগজপত্র শ্রীরামপুরে তাঁর বোনের বাড়ি রেখে এলেন। 
সকালের ট্রেন। ভোর সাড়ে পাঁচটায় বেরতে হবে। তাতে তিনি খুশিই হলেন। ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা তাঁদের যাওয়াটা টেরই পাবে না। অনন্তকে বলে রাখলেন একটা ট্যাক্সি যেন সাড়ে পাঁচটার আগেই এসে যায়। 
সোয়া পাঁচটার মধ্যে বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে বেশ হৃষ্ট মনে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু মেন গেটের সামনে একটা অশান্তির কারণ ঘটল। ফ্ল্যাটের গার্ড রতনলাল তাঁদের দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘বেড়াতে যাচ্ছেন?’ 
কী হবে! রতনলাল যে জেনে গেল। ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে সুদেববাবু উত্তর দিলেন, ‘একটা বিশেষ কাজে যেতে হচ্ছে, দিন দুয়েকের মধ্যেই ফিরব।’ 
বুঝলেন উত্তরটা ঠিক হল না। মালপত্রর বহর দেখে কেউই তাঁর কথা বিশ্বাস করবে না। ট্যাক্সিতে উঠে অনন্ত বলল, ‘কী দরকার ছিল মিথ্যে কথাটা বলার!’ সারা রাস্তা মনের খুঁতখুঁতানিটা গেল না।
হাজারিবাগে বন্ধুর বাড়ি পৌঁছেই মনটা ভালো হয়ে গেল। সুন্দর জায়গা। পাহাড় আর জঙ্গল এত কাছ থেকে তিনি এর আগে দেখেননি।
বাড়িটা শহরের একধারে হওয়ায় একটু ফাঁকা ফাঁকা। এখানে সবক’টা বাড়ির সঙ্গেই অনেকটা করে জমি। এই বাড়িটাও সেই রকম। গেট থেকে অন্তত চল্লিশ ফুট ভিতরে উঁচু বারান্দা। তারপর পাশাপাশি দুটো ঘর। পিছনদিকে রান্নাঘর, খাওয়ার ঘর, কেয়ারটেকারের ঘর। 
কেয়ারটেকারকে খবর দেওয়া ছিল। সে বাজার করে রেখেছিল। 
সামনের বারান্দায় বেতের চেয়ার টেবিল পাতা ছিল। সুদেববাবু বাড়ি পৌঁছে স্নান করে বারান্দায় বসলেন। অনেকগুলো বই এনেছেন সঙ্গে। সারাদিন বারান্দায় বসে বই পড়া যাবে ভাবতেই মনটা খুশি হয়ে উঠল। 
রাতে খাওয়ার পর শুতে যাবার সময় সুদেববাবুর মনে হল কেয়ারটেকারটা তো এই বাড়ির মধ্যেই থাকে। যখন খুশি তাঁর ঘরে ঢুকতে পারে। অনন্তকে ডেকে বললেন লোকটার দিকে একটু নজর রাখতে।
উত্তরে অনন্ত বলল, ‘কী যে বলেন আপনি, ওই তো আপনাকে বলল এখানে কোনওদিন চুরিচামারি হয়নি। তবুও টাকাপয়সা খোলা জায়গায় রাখবেন না। কিছু হলে ওরই বদনাম হবে।’ 
 সকালে সূর্যোদয়ের আগেই রাজ্যের পাখির কলকাকলিতে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। মুখ ধুয়ে হাঁটতে বেরলেন। উত্তরদিকে পাহাড়।  সেই দিকেই হাঁটতে শুরু করলেন। একটু হেঁটে যেতেই বাড়িঘর অনেক কমে গেল। এখন রাস্তার দু’ধারে শুধু গাছপালা। এত মনোরম পরিবেশ, মনের সব দুশ্চিন্তা উধাও হয়ে গেল। 
একঘণ্টা বাদে ফিরে চা নিয়ে বারান্দায় বসলেন। অনন্তরও যে জায়গাটা ভালো লেগেছে সেটা বোঝা গেল জলখাবারে লুচি আর তরকারি করেছে। জলখাবারের পর বই নিয়ে বারান্দায় বসলেন। প্রায় একটা পর্যন্ত বই পড়ে আর মাঝে মাঝে ঝিমিয়ে কাটিয়ে দিলেন। 
দুপুরে দিশি মুরগির ঝোল আর ভাত খেয়ে ঘণ্টাখানেকের একটা ঘুম দিয়ে বিকেলে চা খেয়ে আবার হাঁটতে বেরলেন। সন্ধের পর কিছুই করার থাকে না। তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পরলেন। 
রুটিনটা একইরকম চলতে লাগল। অনন্তও খুব খুশি, কারণ সব কিছু নিয়ে বাবুর এই পেছনে লাগাটা বন্ধ আছে এখানে এসে। 
এর মধ্যে আবার অশান্তি। বিকেলে একটা দোকানে গিয়েছিলেন এক শিশি শ্যাম্পু কিনবেন বলে। নতুন মানুষ দেখে দোকানি জিজ্ঞেস করল, ‘কোন বাড়িতে উঠেছেন?’ উত্তর শুনে সে বলল, ‘বাড়িটা তো বেশ ফাঁকা জায়গায়। সাবধানে থাকবেন।’
বাড়ি ফিরে অনন্তকে বললেন, ‘তোকে কে বলেছে এখানে চুরি হয় না! এখানকার লোক সাবধানে থাকতে বলছে।’
অনন্ত রেগে বলেছিল, ‘কলকাতা কি সাধু-সন্তদের জায়গা নাকি! সেখানে সাবধানে থাকতে হয় না?’
সুদেববাবু মনে মনে স্বীকার করলেন অনন্ত ঠিকই বলেছে। 
সুখের দিন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। দেখতে দেখতে দু’সপ্তাহ শেষ হয়ে গেল। সোমবার কলেজ খুলে যাবে। তাই রবিবার ভোরের ট্রেনে উঠলেন। 
হাওড়া স্টেশনে পৌঁছতেই রাজ্যের সমস্যা মাথার মধ্যে ভিড় করে এল। ট্যাক্সিতে যেতে যেতে যে চিন্তাটা তাঁকে প্রায় পেড়ে ফেলল, সেটা হল বাড়ির কী অবস্থা। চুরিটুরি হয়নি তো! হলেও কাউকেই তো বাড়িতে থাকছেন না বলে জানিয়েও আসেননি! শেষে যা থাকে কপালে ভেবে গাড়িতে হেলান দিয়ে বসলেন। 
ট্যাক্সি থেকে নেমে গেট দিয়ে ঢোকার সময় গার্ড রতনলাল তাঁকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘সব ঠিক আছে, কিছু লোকসান হয়নি।’ 
লোকসান হয়নি মানে কী! ভাবতে ভাবতে সিঁড়ির দিকে এগলেন। ছুটির দিন সন্ধের সময় বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে চেনা গলার আওয়াজ আসছে। এখন মনে হচ্ছে কতক্ষণে বাড়ি পৌঁছে হাত পা ছড়িয়ে বসবেন। 
দোতলায় উঠেই প্রথম ধাক্কাটা খেলেন। তাঁর ফ্ল্যাটের দরজা খোলা, ঘরে আলো জ্বলছে। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। আর এগতে সাহস হচ্ছে না। অনন্তর দিকে চেয়ে দেখলেন সেও বিস্ফারিত চোখে দরজার দিকে চেয়ে আছে। নিজেকে সামলে নিয়ে অনন্তই প্রথমে দরজার দিকে এগল। তার পেছন পেছন সুদেববাবুও এগলেন। দরজার সামনে এসে দেখেন ঘরে পাখা ঘুরছে। পাশের ফ্ল্যাটের সুশোভনবাবুর ছেলে সুরজিৎ একটা সোফায় বসে বই পড়ছে। আওয়াজ পেয়ে সুরজিৎ মুখ তুলল, তাদের দেখে বলল, ‘যাক, আপনারা এসে গেছেন!’
সুদেববাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার বল তো? তুমি ঘরে ঢুকলে কী করে?’ কথাবার্তার আওয়াজ শুনে পাশের ফ্ল্যাট থেকে সুশোভনবাবু বেরিয়ে এলেন। সুদেববাবুকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আশ্চর্য মানুষ মশাই আপনি, কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে গেছেন? সব তো যেত। গত বুধবার রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল একটা আওয়াজ শুনে। মনে হল আপনার ফ্ল্যাট থেকেই এ আওয়াজটা। উঠে সুরজিৎকে ডেকে একটা লাঠি নিয়ে কে কে করতে করতে বেরিয়ে দেখি দুটো লোক পালাচ্ছে। আপনার দরজার লক ভাঙা। আমরা জেগে যাওয়ায় ব্যাটারা ভেতরে ঢুকতে পারেনি। আমি আর চান্স না নিয়ে সুরজিৎকে বললাম, সুদেববাবু যতদিন না ফেরেন, তুই রাতে এখানেই শুবি। তা ও নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করতে পারবে বলে সকাল বিকেল এখানেই পড়াশোনাটা করে। আশ্চর্য অসাবধানী লোক মশাই আপনি, যাওয়ার আগে কোথায় যাচ্ছেন জানিয়ে 
যাবেন তো।’ 
তাঁকে ‘অসাবধানী’ বলায় সুদেববাবুর মুখ দিয়ে কথা সরছে না। পাশে দাঁড়ানো অনন্তর দিকে তাকিয়ে দেখেন তার মুখে আকর্ণবিস্তৃত হাসি।

সম্পর্কিত সংবাদ