নিজস্ব প্রতিনিধি ও সংবাদদাতা: উত্তরে বসিরহাট, হিঙ্গলগঞ্জ থেকে দক্ষিণে সাগর, গোসাবা। সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল—২৪ ঘণ্টায় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল রেকর্ড বৃষ্টিপাতের সাক্ষী থাকল। এই সময়ের মধ্যে কোথাও ১১৭ মিলিমিটার, কোথাও ১৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ভোরের আলো ফোটার পর মানুষ দেখেছেন, সব রাস্তাই কমবেশি জলমগ্ন। স্কুল, হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড—জমা জলের দুর্ভোগ পিছু ছাড়েনি কোথাও। সুন্দরবনের কাকদ্বীপ, নামখানা, পাথরপ্রতিমা ব্লকেও ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছে। দুই ২৪ পরগনার পুরসভা এলাকাগুলির অবস্থাও ছিল তথৈবচ। বারাসত, হাবড়া, অশোকনগর, মধ্যমগ্রাম থেকে মহেশতলা, বজবজ, বারুইপুর, রাজপুর সোনারপুর—জল-ছবির খুব একটা হেরফের হয়নি কোথাও।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় সাগর ও গোসাবা ব্লকে যথাক্রমে ১৭২ ও ১২৫ মিমি বৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের হাজিরা ছিল অনেক কম। রাজপুর সোনারপুর, বারুইপুর, মহেশতলা, বজবজ পুরসভার প্রায় সবক’টি ওয়ার্ড জলমগ্ন হয়ে পড়ে। মঙ্গলবার বেলার দিকে বৃষ্টি কিছুটা কমলে কিছু জায়গা থেকে জল নেমে যায়। পুরসভাগুলিতে বেহাল নিকাশি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে অনেক জায়গায়। নামখানার নারায়ণপুর এলাকায় বেশ কয়েকটি বাড়িতে জল ঢুকে যায়। পাথরপ্রতিমার একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতের রাস্তা চলে গিয়েছে জলের তলায়। দিগম্বরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সমবায় সমিতির সামনে জল জমে যাওয়ায় গ্রাহকদের সমস্যায় পড়তে হয়। কাকদ্বীপ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সামনে জল দাঁড়িয়ে যায়। আউটডোরে ডাক্তার দেখিয়ে হাঁটুসমান জলে দাঁড়িয়ে ওষুধ সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছে মানুষ। কাকদ্বীপের বেসরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলিতে এদিন ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধানের জমি কার্যত ভরা জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা। বারুইপুর পুরসভার ১৪ নম্বর পঞ্চাননতলা থেকে অক্ষয় সঙ্ঘ পর্যন্ত জলমগ্ন। মদারাট স্কুলের সামনেও একই অবস্থা। অভিযোগ, জল জমলেও পাম্প চালায়নি পুরসভা। রায়দিঘি কাছারি মোড়, বাজার, সেতু সংলগ্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। গড়িয়া, রানিয়া, রাজপুর এলাকায় জল জমে। বজবজ পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন রেলের রাস্তারও জল থইথই অবস্থা। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে বসিরহাটে (১১৭.৪ মিমি)। হিঙ্গলগঞ্জে ৯০.২ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এছাড়া, দেগঙ্গা (৬৮.৪), গাইঘাটা (৩৭.৩), বনগাঁ (১৭), বাগদা (২১.৪), হাবড়া (৩০.৬), মিনাখাঁ (২২) এবং বারাকপুর (১৩.৩) এলাকায় ভালো পরিমাণে বৃষ্টি হয়। প্রশাসনের তৎপরতা ছিল যথেষ্ট। কোথাও পোর্টেবল পাম্প, কোথাও জেটিং মেশিন কাজে লাগানো হয়েছে। মধ্যমগ্রাম পুরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রীনগর এলাকায় জল ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মিলনপল্লি, ২২ নং ওয়ার্ডের দেবীগড় ইত্যাদি এলাকায় জল জমেছিল। চেয়ারম্যান নিমাই ঘোষ বলেন, ‘টানা বৃষ্টি হওয়ায় পুরসভার কিছু ওয়ার্ডে জল জমেছিল। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কাজ করছেন আমাদের কর্মীরা।’ জেলা সদর বারাসতের রামকৃষ্ণপল্লি, হৃদয়পুর সংলগ্ন রাস্তা জলের তলায় চলে যায় এদিন ভোরের বৃষ্টিতে। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লোকনাথ মন্দির সংলগ্ন এলাকা থেকে নিচুমাঠ, ২২ এবং ২৩ নম্বর ওয়ার্ডেও কিছু এলাকা জলমগ্ন। চেয়ারম্যান অশনি মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেনের জল উপচে রাস্তায় জমেছে। তবে এটা দীর্ঘস্থায়ী নয়।’ অশোকনগর পুরসভার গোলবাজার, চৌরঙ্গী, মানিকতলা ইত্যাদি এলাকাও জলমগ্ন হয়ে পড়ে। হাবড়া থানার সামনেও হাঁটুসমান জল জমেছিল।