বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাত ধরে চড়চড়িয়ে চড়েছে ডিমের দাম। দিনকয়েক আগে ছ’টাকায় আটকে থাকা ডিম আচমকা হয়ে গিয়েছে সাড়ে সাত টাকা। আগুনে বাজারদরের কারণে যাঁরা ডিমের ঝোল ভাতে আস্থা রেখেছিলেন, তাঁরাও পড়েছেন বিপাকে। অথচ ভোট পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডিম ছিল একেবারেই অপাংক্তেয়।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলার ভোট বাজারের হট আইটেম ছিল মাছ। বাঙালিআনার জাত চেনাতে ভোটবাবুদের মৎস্য-তোয়াজ ছিল জমকালো। ভোটারের চেয়েও বেশি যত্নআত্তি জুটেছিল রুই-কাতলার কপালে। প্রচারে বেরিয়ে হঠাৎ বাজারমুখো হয়ে পেল্লায় মাছ বাগিয়ে হাসি হাসি মুখে ছবি তোলা ছিল প্রায় সব প্রার্থীর মাস্ট কর্মসূচি। বাদ যায়নি মাংসও। বাঙালির কপালে আমিষ জুটবে কি জুটবে না, এই রাজনৈতিক বিতর্কের ব্যাটন ছিল মাছ-মাংসেরই হাতে। এই টানাপোড়েনের মাঝে ডিমকে কেউ আমিষ হিসেবে পাত্তাই দেয়নি। পরিহাস এমনই, ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক নাটকীয়তার নায়ক হয়ে গেল শেষমেশ ওই ডিমই। কোথাও টাটকা, কোথাও পচা— মানুষকে অপমান করার ঐতিহ্যবাহী উপকরণ হিসেবে গোবর, টোম্যাটোর থেকে একশো যোজন এগিয়ে গিয়েছে ডিম। কাকতালীয় হলেও, এই ‘রাজনৈতিক তামাশা’র মাঝে চড়চড়িয়ে বেড়ে গিয়েছে ডিমের দর। তবে তা শুধু যে ছোড়ার কারণে শুধু নয়। অন্যান্য কারণও আছে।
এমনিতেই গরমকালে ডিমের আকার ছোটো হয়। তাই খাদ্যরসিকদের একটা ডিমে মন ভরে না। ফলে বেশি কিনতে হয়। খরচ যায় বেড়ে। তার উপর দাম আরও বাড়লে সমস্যাও বাড়ে। কিন্তু কেন এত চড়া দাম? ওয়েস্ট বেঙ্গল পোলট্রি ফেডারেশনের অন্যতম কর্তা এবং ন্যাশনাল এগ কো-অর্ডিনেশন কমিটির এ রাজ্যের চেয়ারম্যান মদনমোহন মাইতির কথায়, ‘পশুখাদ্যের দাম গত একমাসে খুব বেড়ে রয়েছে। পোলট্রি মালিকদের উৎপাদন খরচ হয়ে গিয়েছে লাগামছাড়া। মুরগির অন্যতম খাবার হল বিভিন্ন দানাশস্য ও তৈলবীজের থেকে তৈরি খোল। সবথেকে জনপ্রিয় সোয়াবিনের খোলের দর একমাস আগে ছিল ৪১ থেকে ৪২ টাকা, তা এখন ৭৮ টাকা। অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাদাম, সূর্যমুখী ও তিলের খোলের দর। ফলে মুরগির দানাপানি জোটাতেই নাভিশ্বাস ব্যবসায়ীদের। ফলে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।’ মদনমোহনবাবু জানান, এই কারণেই মুরগির দামও অনেকটা বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু গরমের কারণে বাজারে মাংসের চাহিদা কম থাকায়, দর বাড়েনি। ফলে বিপুল লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে পোলট্রি ফার্মগুলিকে। কেন খোলের দাম আচমকা এতটা অস্বাভাবিকরকম বেড়ে গিয়েছে তা এখনও অজানা। কেন্দ্রীয় সরকার যাতে দ্রুত এই বিষয়টি নজরে আনে এবং সুরাহা করে, তার জন্য চিঠি লিখে আর্জি জানানো হয়েছে।
এমনিতে বাজারে পোলট্রির ডিমের চাহিদা স্বাভাবিক মাত্রাতেই আছে। অন্যদিকে প্রাক্তন নেতা-মন্ত্রীদের গায়ে ডিম ছোড়ার সংস্কৃতি একেবারে স্থানীয়ভাবে ডিমের বাজারকে চাঙ্গা করেছে কোথাও কোথাও। তার সঙ্গে সার্বিকভাবে বাজার বৃদ্ধির কোনও সম্পর্ক নেই, জানাচ্ছেন ডিম ব্যবসায়ীরা। সঙ্গে পচা ডিমের চাহিদাও যে কিছু এলাকায় রয়েছে, তা জানাতে ভোলেননি তাঁরা। তার জন্য অবশ্য একটু খাটতে হচ্ছে। টাটকা ডিমকে হালকা তাপে কিছুটা ভাপিয়ে রোদে একদিন ফেলে রাখলেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে পচা ডিম। সাপ্লাই দিলেই হাতে হাতে নগদ পেমেন্ট। কাটতি থাকলে তাই পচা ডিমের বাজারের রাশ আলগা করতে রাজি নন দোকানদাররা।