Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাংলায় হিন্দুদের এত বড় অসম্মান!

বাংলায় হিন্দুদের এত বড় অসম্মান!
  • ১৬ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: শুধু দু’টো ভোটের জন্য হিন্দুদের এত বড় অপমান! তাও বিধানসভায় দাঁড়িয়ে। বলা হচ্ছে, ছাব্বিশে নির্বাচিত সংখ্যালঘু বিধায়কদের চ্যাংদোলা করে বাইরে নিক্ষেপ করা হবে। এই সুতীব্র বিভাজন নিয়ে অকাতরে জীবে প্রেম আর অপার সহ্যের শিক্ষা বিলানো হিন্দু ধর্ম বাঁচতে পারে! উন্মত্ত দুষ্কৃতীদের পাথর ছোড়ার মতোই আগ্রাসী হিন্দুত্বকে প্রতিপক্ষের দিকে নিক্ষেপ করা চলছে তার অতীত সংহতির গৌরবকে জলাঞ্জলি দিয়ে। কোথায় হচ্ছে এই নিঃশ্বাস বন্ধ করা অপকর্ম? নেতাজি, রবীন্দ্রনাথের বাংলায় এমন দুঃসাহস কার? শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দের সাধনাক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে উন্মত্ত গেরুয়াবাদী একটি দল হিন্দুত্বের এমন সঙ্কীর্ণ এবং অবমাননাকর সংজ্ঞা নিরূপণ করে কোন আক্কেলে? এমন কথা কে বলছেন, কোন জ্বালায় বলছেন, পদে পদে ব্যর্থ হয়ে দিল্লির কাছে নম্বর বাড়াতে বলেছেন কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, কোন দলের হয়ে বলছেন, কোন পতাকার তলায় দাঁড়িয়ে বলছেন? সেই দলের আদর্শ ও শিক্ষা কি মাত্র কয়েকটা ভোট পেতে (পড়ুন কিনতে!) এতটা নীচে নামতে পারে? হিন্দুত্বের এমন বেহায়া বিপণন ধর্মে সইবে তো! আমার ছেলে যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাউকে মারব বলে, সেই আস্ফালন পিতা হিসেবে আমার অসম্মান না গৌরব? দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন পেরিয়ে এসেও যাঁরা এই সামান্য ফারাকটা বোঝেন না, কিংবা বুঝেও না বোঝার ভান করেন, তাঁরা বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখেন কোন আক্কেলে? যাঁরা এই কাজটা করছেন তাঁদের হিসেবের মধ্যে ধরছি না। সবচেয়ে আশ্চর্যের হচ্ছে, নিজেদের জাতীয়তাবাদী দাবি করা দলটি এখনও মুখ খোলেনি। ব্যবস্থাও নেয়নি। দুঃখ একটাই, ব্যক্তিগত স্বার্থে হিন্দুত্বকে পদদলিত করার এমন দুঃসাহস সামান্য দলবদলুকে কে দিল? এই সনাতনী সংস্কৃতির গর্ব করি আমরা? হিন্দুত্বের স্বঘোষিত সোল ডিস্ট্রিবিউটররা মনে এত হলাহল নিয়ে পবিত্র কুম্ভে পুণ্য অর্জন করতে যান। এদের মনুষ্যত্বের তার কোন সুরে বাঁধা, তা বাংলার আম জনতার কাছে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

Advertisement

সময়টা নিঃসন্দেহে কঠিন। আরও কঠিন হবে আগামী কয়েক মাসে। বাংলা, বাঙালি ও তার অস্মিতা ফের একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক এক বছর বাকি। পরীক্ষায় প্রস্তুতি ঠিকমতো না হলে ছাত্র অসদুপায় অবলম্বনের পরিকল্পনা আঁটে। যদি দেখে সিলেবাসের অর্ধেকই পড়া হয়নি, তাহলে হাতে পায়ে সম্ভাব্য উত্তর লিখে হলে ঢোকে। জুতোর মোজার ভিতরে বইয়ের পাতা ছিঁড়ে নিয়ে যায়। সোজা ভাষায় খুলে আম টুকলির আয়োজন। তাতেও কাজ না হলে ইনভিজিলেটরকে আক্রমণ করে, ভয় দেখায়। বাইরে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেয় আজকাল। শেষে খাতাটাই বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ, সে জানে বাঁকা পথ ছাড়া পরীক্ষায় পাশ মার্ক কেন, একশোয় দশও মিলবে না। এসবই বড্ড চেনা ছক। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলেরও আজ সেই দশা। অর্ধেক সিলেবাসই অন্ধকারে। ক’টা জেলায় সবক’টি বুথে সংগঠন আছে? মণ্ডল সভাপতি ঠিক করতেই সর্বত্র হিমশিম। পাছে রাজ্য সভাপতির নাম ঘোষণা করলেই দলে নরক গুলজার শুরু হয়, তাই দিল্লির নেতৃত্ব ক্রমশ সময় কিনছেন। সদস্য সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি অনেক কেঁদে কঁকিয়েও। এক এমপিকে দেখা গিয়েছে বিয়ে বাড়ি ঘুরে ঘুরে সদস্য সংগ্রহ করতে। অমিত শাহের মঞ্চ থেকে হিন্দি সিনেমার এক ‘বৃদ্ধ’ নায়ক হুঙ্কার ছেড়েছিলেন, প্রতিটি জেলায়, মহল্লায় তিনি নাকি ঝড় তুলবেন। দেখে নেবেন প্রতিপক্ষকে। তারপর অনেক পূর্ণিমা, অমাবস্যা, জোয়ার-ভাটা খেলে গিয়েছে, কোথায় কতবার গিয়েছেন তিনি। প্রথম দিনই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মঞ্চে বসিয়ে এমন বেফাঁস কথা বলে ফেললেন যে, তাঁকে আর বেশি ব্যবহার করতে সাহস পাচ্ছে না দল। তাঁর বোঝা উচিত, সবটাই সিনেমার সেট নয়। মৃণালবাবুর ঐতিহাসিক মৃগয়াও নয়। অগত্যা হচ্ছে হবে করে পৌষ সংক্রান্তি থেকে শুরু করে দোল কেটে গেল, বঙ্গ বিজেপি’র মাথা ঠিক হল না। বুথ সংগঠন তো দূর অস্ত! 
সোজাসুজি লড়ে কিংবা টুকলি করে পাশমার্কও মেলার কোনও আশা নেই দেখে এবার নতুন খেলা। গতবার নানা লোভ দেখিয়ে তৃণমূল ভাঙাকে বাংলা জয়ের অস্ত্র করা হয়েছিল। প্রতিদিন দলবদল মেলা। দোসর ছিল, সিবিআই, ইডি’র চমকানো। রাতবিরেতে বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি। পরের সপ্তাহে সেই নেতাই জেল যাত্রা ঠেকাতে তৃণমূলকে কয়েক গাছা তোপ দেগে গেরুয়া শিবিরে। ব্যাস আর ইডি, সিবিআই তাঁর বাড়ির পথ মাড়াবে না। কিন্তু এবার আর ওই স্টেরয়েডে কাজ হচ্ছে না। উল্টে বঙ্গ বিজেপি’ই ভাঙছে। ৭৭ থেকে কমতে কমতে বিধায়ক সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৬৫তে। আরও এক বছর বাকি। জেলায় জেলায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে হতাশ আক্ষেপ! দল না বদলালে জিততে পারব না যে, তাই বাধ্য হয়ে...।
প্রশ্নটা কিন্তু শুধু বাংলার নয়।  কিংবা উত্তরবঙ্গকে আলাদা করে দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গের উন্মত্ত উল্লাসেরও নয়। যাঁরা কস্মিনকালে বাংলার পথ ঘাট নদী প্রান্তরে আসেন না, ন্যায্য পাওনাটুকুও আটকে রাখেন বছরের পর বছর, সুদে আসলে সেই একশো দিনের টাকা, আবাসের বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয় মানুষ; সেই গেরুয়া নেতানেত্রীদের আর কী বলার থাকতে পারে। দশ বছরেরও বেশি একটানা যে দল দেশ শাসন করেছে, সেই দলের এক জনপ্রতিনিধি বিধানসভায় বলছেন, পরের বার যেসব মুসলিম বিধায়ক জিতে আসবেন তাঁদের তিনি চ্যাংদোলা করে বাইরে ফেলে দেবেন। এই উক্তির পরও সংবিধান মেনে সবকা বিকাশের আদর্শ মাথায় করে চলা দলটি কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। সতর্কও করেনি। নিদেনপক্ষে একটা বিবৃতি পর্যন্ত দিয়ে ভুল স্বীকার করার সৎ সাহসটুকুও দেখায়নি। যিনি বলেছেন, তিনি না হয় দলবদলু। ওসব তাঁর জলভাত। তাঁর পরিবারের লোকজন দলত্যাগ করলেও সহজে পদত্যাগ করেন না। এ রাজ্যেরই একটা বিশেষ অঞ্চলকে পৈতৃক সম্পত্তি  ভাবেন। কিন্তু তাঁর দল? আরএসএস ও তার চালিকাশক্তি যে আদর্শকে ভর করে চলে, তারাও কি এই নির্মম বক্তব্যকে সমর্থন করেন! হায় ভোটের বাজারে হিন্দুত্বের আজ কী নিদারুণ হাঁসফাঁস অবস্থা? চিরদিন জেনে এসেছি, হিন্দুত্ব কাউকে দূরে ঠেলে দেয় না। চৈতন্যদেব থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকান্দের ভাবধারা সবাইকে আপন করে নেওয়ার আদি ও অকৃত্রিম মূল্যবোধের দ্বারাই চালিত। অথচ নাগপুরের আগমার্কা কট্টরবাদীরা তার থেকে ১৮০ ডিগ্রি তফাতে, ভোট কেনার উদগ্র বাসনায়।
হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণকে আরও উদগ্র রূপ দেওয়া ছাড়া এ রাজ্যে বিজেপি’র তেমন কিছুই করার নেই। আবার বাইনারি ভেঙে গেলে কংগ্রেস ও সিপিএম ভোট কাটবে, সেই ভয়ও আছে। তাতেও গতবারের ৭৭ আসন প্রাপ্তিরও অনেক আগেই থেমে যেতে হবে। সকাল সন্ধে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সমেত সাঙ্গপাঙ্গদের ডেলি প্যাসেঞ্জারিতেও কাজ হবে না। উত্তরবঙ্গেও একুশের ছিটেফোঁটাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এই সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে চাকরি বাঁচাতে কেউ কেউ ভারসাম্য হারিয়ে অসাংবিধানিক সঙ্কীর্ণ কথা বলবেন। আস্ফালন করবেন আর তাঁর আদর্শবান দলটি চুপ করে সব সহ্য করবে। প্রশ্রয় দেবে। যাবতীয় উস্কানি মেনে নেবে। যে মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে আম্বেদকর সাহেব সংবিধান রচনা করেছিলেন তার মূলে কুঠারাঘাত করবে। কেন? না গোটা পূর্বভারত আমাদের দখলে, বাদ শুধু বাংলা। বাংলায় এক অসমসাহসী নারী আছেন। যতই স্পিন দিন, ঘণ্টায় দেড়শো কিলোমিটারের চেয়ে গতিতে বল করুন, কালীঘাটের লড়াকু মহিলা নটআউট ছিলেন ও থাকবেন। তাই বালখিল্যদের এমন আস্তিন গোটানো মারমুখী বডি ল্যাঙ্গুয়েজকে  এবারও কেউ বিশেষ পাত্তা দেবেন বলে মনে হয় না। মধ্যিখানে শুধু রক্তাক্ত হবে হিন্দুত্বের সোনালি ঐতিহ্য, উজ্জ্বল অতীত!
ভোটার তালিকায় কারচুপি, হিন্দু মুসলিম বিভাজন আর সারা দেশের সমস্ত কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নামিয়ে অগুনতি দফায় ভোট করেও কি বঙ্গ দখল হবে? যোগ্য উত্তর দিতে কিন্তু তৈরি হচ্ছে বঙ্গবাসী।

সম্পর্কিত সংবাদ