অলকাভ নিয়োগী, বিধাননগর: ‘লিখিব পড়িব মরিব দুঃখে, মৎস্য মারিব খাইব সুখে’। বাঙালির সঙ্গে মাছের সম্পর্ক চিরন্তন। তাই ‘মাছে-ভাতে’র পরিচয় পেয়েছে বাঙালি। তবে, কৃত্রিম প্রজননের উদ্ভাবন না-হলে, নদী-পুকুরের প্রাকৃতিক মাছ দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব হত না। যাঁর আবিষ্কারে বাঙালির পাতে আজ সস্তায় রুই-কাতলা-মৃগেল, যে বাঙালি বিজ্ঞানীর হাত ধরে ভারতে প্রথম মাছের সফল কৃত্রিম প্রজনন হয়েছিল, সেই ডঃ হীরালাল চৌধুরী প্রয়াত। ভারতের নীল বিপ্লবের জনক তিনি। তাঁকে বলা হয়—ফাদার অব ব্লু রেভোলিউশন ইন ইন্ডিয়া। ১৯৫৭ সালের ১০ জুলাই তাঁর কৃত্রিম প্রজনন গবেষণা ঐতিহাসিক সাফল্য পায়। তাই ওই দিনটিকে সামনে রেখে প্রতি বছর পালিত হয় ‘ন্যাশনাল ফিশ ফার্মার ডে’। তবে, এহেন কিংবদন্তি বাঙালি আজ কার্যত ‘বিস্মৃতপ্রায়’! অবিভক্ত বাংলায় সিলেটের কুবাজপুর গ্রামে ১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর হীরালালের জন্ম। তিনি কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে প্রাণীবিদ্যায় স্নাতক, বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে প্রাণীবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৎস্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন হীরালাল চৌধুরী। পিএইচ ডি করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৪৮ সালে বারাকপুরে আইসিএআর–সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (সিফরি) গবেষক হিসাবে যোগ দেন। সে-সময় ভারতে মাছচাষে বড়ো সমস্যা ছিল, উন্নতমানের ডিমপোনার অভাব। মূলত নদী ও প্রাকৃতিক উৎসের উপর নির্ভর করতে হত। ডিমপোনা বর্ষাকাল ছাড়া পাওয়াও যেত না। ফলে, চাষিরাও সমস্যার সম্মুখীন হতেন। মাছের উৎপাদনও সীমিত ছিল। তিনি মনে করেন, যদি মাছের কৃত্রিম প্রজনন সম্ভব না-হয়, তাহলে কোনোভাবেই উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের গবেষণার পর পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে সংগৃহীত হরমোন ব্যবহার করে ভারতীয় প্রধান কার্প মাছ—রুই, কাতলা ও মৃগেলের কৃত্রিম প্রজননে সফল হন। ১৯৫৭ সালের ১০ জুলাই তাঁর গবেষণা ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করে। তারপর থেকেই ভারতে বেড়েছে মাছচাষ। বেড়েছে উৎপাদনও। অর্থাৎ ঐতিহাসিক সাফল্যের সাতদশক এবার। ১০ জুলাই তারিখটি ভারতীয় মৎস্যবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন হিসাবে আজও বিবেচিত হয়। সিফরির ডিরেক্টর ডঃ প্রদীপ দে বলেন, প্রতি বছর জাতীয় মৎস্যচাষি দিবস উপলক্ষ্যে ভারতের প্রখ্যাত মৎস্যবিজ্ঞানী ডঃ হীরাল চৌধুরীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তাঁর বৈপ্লবিক গবেষণা এবং কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির উদ্ভাবন দেশীয় মৎস্যচাষে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।



